মব দিয়ে ভয় দেখানো গণতন্ত্র-রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি: জিল্লুর রহমান

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও উপস্থাপক জিল্লুর রহমান বলেছেন, মব দিয়ে কাউকে ভয় দেখানো কেবল গণতন্ত্রের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্যও গুরুতর হুমকি। সম্প্রতি ইউটিউবের এক ভিডিওবার্তায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে উগ্র মৌলবাদের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে, যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নেতাকর্মীদের সতর্ক করে বলেছেন, যেন ধর্মের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজে বিভ্রান্তি না ছড়ানো হয় এবং দেশের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট না হয়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জিল্লুর রহমান জানান, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোরআন-হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কোথাও বলা হচ্ছে, একটি নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিলে ‘বেহেশত নিশ্চিত’, আর না দিলে ‘ঈমান নষ্ট’। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এসব ভিডিও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, যা সমাজে বিভাজন ও উগ্রতার পরিবেশ তৈরি করছে।
বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী ওলামা দলও এ ব্যাপারে সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, একটি ইসলামী রাজনৈতিক দল ধর্মকে ব্যবসার হাতিয়ার বানিয়ে নির্বাচনে সুবিধা নিতে চাইছে। তারা একে ‘ভোটের ইসলাম’ বলে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, কিছু ইসলামী দলের উগ্রবাদী বক্তব্যকেও রাজনৈতিক প্রতারণা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জিল্লুর রহমান আরও বলেন, মব রাজনীতির পুনরুত্থানও উদ্বেগজনক। বিএনপি নেতা ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পর তার বাড়ির সামনে মব জড়ো হয়ে হত্যার হুমকি দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) একে মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিএনপি মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিলেও, দলের ভেতরে মবের চাপ ও প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে মব ভায়োলেন্স নতুন নয়। ২০১৩ সালের হেফাজতের আন্দোলন, ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলা কিংবা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগানো হয়েছে। শিক্ষাঙ্গনেও মৌলবাদী ছাত্র রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে প্রার্থী দেওয়াই তার উদাহরণ।
তার মতে, শুধু বিবৃতি দিয়ে মৌলবাদ ঠেকানো সম্ভব নয়। এর জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক দলগুলোর সততা এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
জিল্লুর রহমান বলেন, ‘মত প্রকাশের বিরোধিতা থাকলে আইনের পথ খোলা আছে। কিন্তু ভয় দেখিয়ে কাউকে চুপ করানো গণতন্ত্রের জন্য যেমন হুমকি, তেমনি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যও বিপজ্জনক।’ তার মতে, বাংলাদেশ এখন এক সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ধর্ম, রাজনীতি ও মব মানসিকতা মিলে নতুন বিভক্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর সমাধান সম্ভব কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বহুত্ববাদ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।