‘চোখ উলটে দেওয়া হয়েছে, ঠোঁট-গোপনাঙ্গসহ সারা গায়েই কামড়-আঁচড়ের দাগ’

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:৩৩

পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ১২ বছর বয়সী এক মুসলিম কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার ঘটনায় রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছে। গত শনিবার, ৪ জুলাই থেকে নিখোঁজ থাকার পর রোববার সকালে স্থানীয় একটি পুকুর থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বস্তাবন্দি ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। জানাজার আগে গোসল করানোর সময় এবং পরবর্তী ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে উঠে আসা নির্যাতনের বর্ণনা জনমনে গভীর নাড়া দিয়েছে। ঘটনার বিচারের দাবিতে বারুইপুরসহ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে দফায় দফায় বিক্ষোভ, সড়ক ও রেলপথ অবরোধের ঘটনা ঘটেছে।

নিহত কিশোরীর জানাজার আগে গোসল করানোর সময় তার দাদি কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ করেন, নাতনির একটি চোখ উপড়ে দেওয়া হয়েছে, ঠোঁট কেটে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে গোপনাঙ্গে কামড় ও আঁচড়ের অসংখ্য চিহ্ন ছিল বলে তিনি দাবি করেন।

পরিবারের এই দাবির সঙ্গে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনের বিভিন্ন তথ্যের মিল পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে তারা জানায়, কিশোরীকে হত্যার পর নয়, জীবিত অবস্থায় হাত-পা বেঁধে বস্তার মধ্যে ভরে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তার ফুসফুসে কাদামিশ্রিত পানি পাওয়া গেছে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে পানিতে ডোবার সময়ও সে জীবিত ছিল এবং বাঁচার চেষ্টা করছিল। প্রতিবেদনে মাথা ও যৌনাঙ্গে একাধিক ভারী আঘাতের চিহ্নের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং জীবিত অবস্থায় পানিতে ডুবে শ্বাসরোধ হওয়ার কারণেই শনিবার গভীর রাতে তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ঘটনার পর এলাকায় তীব্র জনরোষের সৃষ্টি হলে উত্তেজিত জনতা এক সন্দেহভাজনকে গণপিটুনি দেয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এরপর পুলিশ অভিযান চালিয়ে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে সিসি ক্যামেরার দৃশ্য সামনে আসে। সেখানে ঘটনার দিন বিকেল ৪টা ৪১ মিনিটে কিশোরীর পেছনে লাল গেঞ্জি ও নীল টুপি পরা এক যুবককে যেতে দেখা যায়। স্থানীয়রা তাকে প্রভাস মণ্ডল হিসেবে শনাক্ত করেন।

এ ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত আনন্দ সর্দার, প্রভাস মণ্ডল ও দিবাকর সর্দারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার হওয়া আনন্দ সর্দার এলাকাভিত্তিক এক সক্রিয় হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির কর্মী হিসেবে পরিচিত বলে জানানো হয়েছে। আদালতের নির্দেশে তাদের ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও তিনজনকে আটক করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি দৃশ্যধারণে আটক প্রভাস মণ্ডলকে বলতে শোনা যায়, মেয়েটি চিৎকার করছিল। এরপর আনন্দ ও তার তিন বন্ধু তার গলায় পা চেপে ধরে টেনে বাগানের ভেতরে নিয়ে যায়। ঘটনার সময় তারা মদ্যপ অবস্থায় ছিল বলেও জানা গেছে।

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় রাজ্য পুলিশ ছয় সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করেছে। রাজ্য পুলিশের মহাপরিদর্শক সিদ্ধনাথ গুপ্ত নিজেই তদন্ত তদারকি করছেন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, হত্যা, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারাসহ শিশু সুরক্ষা আইনের কঠোর ধারায় মামলা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বারুইপুরের তিনটি থানা এলাকায় ১৬৩ ধারা জারি করে সব ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে নবান্ন থেকে সরাসরি বারুইপুরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যান রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে নির্যাতিতার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি গভীর সমবেদনা জানান এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, পরিবারের সব দাবি পূরণ করা হবে এবং অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার গঠনের পর থেকে নারী নির্যাতন উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। তার ভাষ্য, মা-বোনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

এর আগে সকালে নির্যাতিতার বাড়িতে যান রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ও ভারতীয় জনতা পার্টির নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়। অন্যদিকে, বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে কয়েকজন বিধায়ক এলাকায় গেলে স্থানীয়দের একাংশের ক্ষোভের মুখে পড়েন। এনডিএ জোটকে সমর্থনকারী তৃণমূলের বিদ্রোহী দুই সাংসদ সায়নী ঘোষ ও কাকলি ঘোষ দস্তিদার ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, দলের শীর্ষ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে ফোন ও দৃশ্যসংযোগের মাধ্যমে কথা বলে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।

তৃণমূলের অভিযোগ, নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাধা দেওয়া হয়েছে। দলটির দাবি, তাকে কার্যত গৃহবন্দি করে রাখা হয়। গত রোববার গভীর রাতে কলকাতার কালীঘাটে তার বাসভবনের সামনে বিপুলসংখ্যক রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং চারপাশে ব্যারিকেড বসানো হয়।

পুলিশি ঘেরাটোপের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজপথে নেমে আসেন। বারুইপুরের কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদ এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে তিনি মোমবাতি মিছিলে নেতৃত্ব দেন। হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে আয়োজিত ওই কর্মসূচিতে সংসদ সদস্য দোলা সেন, প্রতিমা মণ্ডল ও ডেরেক ও'ব্রায়েনসহ দলীয় নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বারুইপুরের নাবালিকা ‘অপরাজিতা’র ওপর চালানো নির্মম নির্যাতন অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দাবি করেন, নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার উদ্যোগ নিলেও ভারতীয় জনতা পার্টি সরকারের পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী তাকে নজরবন্দি করে রেখেছিল। তিনি আরও জানান, পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান এবং নারী নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

ঘটনার পরও বারুইপুরে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন জানিয়েছে, অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার ও মর্যাদার গল্পের সূচনা হোক এখনই: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সদ্য. ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: রোববার থেকে শুরু পোস্টাল ভোটের নিবন্ধন সদ্য. রাজধানী থেকে গ্রেপ্তার আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি সদ্য. একসঙ্গে পুলিশের ৭ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বদলি সদ্য. জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন ঘিরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী সদ্য. চাপের কাছে মাথা নত করবে না ইরান: জাতিসংঘে পেজেশকিয়ান সদ্য. সরকারি সব কলেজের উদ্দেশে মাউশির জরুরি নির্দেশনা সদ্য. ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে সহায়তা চাইল বাংলাদেশ সদ্য. আমার রিসার্চের সাবজেক্ট ঠিক করে দিয়েছিলেন তারেক রহমান: শিক্ষামন্ত্রী সদ্য. ট্রেনের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি: রেলমন্ত্রী সদ্য. রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার ও মর্যাদার গল্পের সূচনা হোক এখনই: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সদ্য. ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: রোববার থেকে শুরু পোস্টাল ভোটের নিবন্ধন সদ্য. রাজধানী থেকে গ্রেপ্তার আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি সদ্য. একসঙ্গে পুলিশের ৭ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বদলি সদ্য. জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন ঘিরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী সদ্য. চাপের কাছে মাথা নত করবে না ইরান: জাতিসংঘে পেজেশকিয়ান সদ্য. সরকারি সব কলেজের উদ্দেশে মাউশির জরুরি নির্দেশনা সদ্য. ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে সহায়তা চাইল বাংলাদেশ সদ্য. আমার রিসার্চের সাবজেক্ট ঠিক করে দিয়েছিলেন তারেক রহমান: শিক্ষামন্ত্রী সদ্য. ট্রেনের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি: রেলমন্ত্রী