চীনকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম শক্তিশালী দেশে পরিণত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।
১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে দায়িত্ব পালন করেন ঝু রংজি। তার নেতৃত্বেই চীনের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগদানের পথ সুগম হয়। এর ফলে চীনের কারখানাগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উন্মুক্ত হয় এবং দেশটিতে বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আসতে শুরু করে।
চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রূপকার ছিলেন ঝু রংজি। তিনি স্থানীয় সরকারের কর আদায়ের ক্ষমতার একটি বড় অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে নেন, লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ বা বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করেন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ির মালিকানা বাড়ানোর উদ্যোগ নেন।
চীনের অনেক মানুষ তাকে কঠোর ও বাস্তববাদী নেতা হিসেবে স্মরণ করেন। তার সময়ে দেশটি দুই অঙ্কের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। নিজের মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রেও তিনি খুব একটা রাখঢাক করতেন না।
১৯৯৮ সালে তিনি বলেছিলেন, চীন এমন ‘অনেক সম্ভাব্য সংকটের’ মুখোমুখি, ‘যেগুলো যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে’। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘সাধারণ মানুষ আমাদের নিয়ে নানা বিষয়ে অসন্তুষ্ট। বিশেষ করে কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং কিছু স্থানীয় কর্মকর্তার স্বৈরাচারী আচরণ নিয়ে মানুষের ক্ষোভ রয়েছে।’
দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকারদের তিনি ‘অর্ধবুদ্ধিসম্পন্ন’ বলে অভিহিত করেছিলেন। আবার ইয়াংজি নদীর তীরবর্তী বাঁধ ও বন্যা প্রতিরোধী বাঁধগুলোকে তিনি ‘টোফু তৈরির পর অবশিষ্ট বর্জ্যের মতোই দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
তার নেতৃত্বে চীনের অর্থনীতি স্থিতিশীল হতে শুরু করে এবং দুর্নীতি দমনে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে দেশটি দ্রুত একটি শক্তিশালী উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হতে থাকে। এর মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট বিশ্বের তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন একটি দেশ থেকে চীন বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যায়।
তবে তার নেওয়া সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনাও ছিল। এসব সংস্কারের ফলে পাঁচ বছরে প্রায় ৩ কোটি মানুষ চাকরি হারান। অন্যদিকে, দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে দেশে আয়বৈষম্যও বেড়ে যায়।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ঝু রংজির জীবনকে ‘বিপ্লব, সংগ্রাম ও গৌরবের’ জীবন হিসেবে বর্ণনা করেছে। ১৯২৮ সালে চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুনান প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন ঝু রংজি। বৈদ্যুতিক প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন।
১৯৪৯ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন তিনি। তবে রাজনৈতিক জীবনে তাকে দুবার কোণঠাসা করা হয়। প্রথমবার মাও সে তুংয়ের অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করে সেগুলোকে ‘অযৌক্তিক’ বলায় তাকে ‘ডানপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ও তিনি রাজনৈতিকভাবে নিগৃহীত হন।
মাও সে তুংয়ের মৃত্যুর পর ঝু রংজি আবারও রাজনৈতিক পরিসরে ফিরে আসেন। ১৯৯১ সালের মধ্যে তিনি চীনের অর্থনীতির দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপ্রধানমন্ত্রী পদে উন্নীত হন। এর সাত বছর পর ১৯৯৮ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।
২০০২ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের যোগদানের লক্ষ্যে কঠিন ও দীর্ঘ আলোচনায় নেতৃত্ব দেন ঝু রংজি। তার সময়েই চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রবেশের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়।
ঝু রংজির মৃত্যুতে প্রকাশিত রাষ্ট্রীয় শোকবার্তায় তাকে ‘চীনের কমিউনিস্ট পার্টির একজন অসাধারণ সদস্য ও বিশ্বস্ত কমিউনিস্ট যোদ্ধা’ এবং ‘দল ও রাষ্ট্রের একজন অসাধারণ নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
সদ্য সংবাদ/এসএস