মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে চলা রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী অবসানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এক সাইড ইভেন্টে তিনি এসব প্রস্তাব দেন। সেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ আরও জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে বাঁচতে এখনো মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে আসছে। অন্যদিকে শিবিরগুলোতে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে বাস্তুচ্যুতির এই সংকটের সঙ্গে নতুন একটি প্রজন্মও যুক্ত হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মৌলিক প্রয়োজন পূরণে বাংলাদেশ বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। শিবিরগুলোতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রায় ছয় হাজার লার্নিং সেন্টারে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে শিশুদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
রোহিঙ্গা তরুণদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তারেক রহমান। তাঁর ভাষ্য, রাখাইন রাজ্যে ভবিষ্যতে ফিরে গিয়ে সমাজে পুনরায় যুক্ত হওয়ার জন্য তাদের প্রস্তুত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয়ের জন্য কক্সবাজারের শিবিরগুলো উপযুক্ত নয় বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। শিবিরের জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে দেশের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তারেক রহমান বলেন, এই সংকটের প্রভাব শুধু রোহিঙ্গাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কক্সবাজারের স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীকেও এর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বহন করতে হচ্ছে। সময় যত গড়াচ্ছে, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির ব্যয়ও তত বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও হতাশার কারণে মানব পাচার, অভিবাসী পাচার এবং মাদক পাচারসহ বিভিন্ন আন্তদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু মানুষ নৌপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর মতে, একটি দেশের অমীমাংসিত সংকট শেষ পর্যন্ত গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার প্রয়োজন বাড়লেও অর্থায়নের পরিমাণ কমে যাচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালের পরিকল্পনায় সেই চাহিদা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলার করা হয়েছে, যা মূলত ন্যূনতম জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য নির্ধারিত।
বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন সহযোগিতা করে আসা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ধন্যবাদ জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন তাদের সহায়তা আরও জরুরি। তাঁর মতে, মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়টি রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার কারণ হতে পারে না।
রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ এবং এর স্থায়ী সমাধান—দুটিই মিয়ানমারে নিহিত বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
রোহিঙ্গাদের ওপর জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ ও জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুতর নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি বলেও জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, সংকটকে কেবল মানবিক সহায়তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার পরিবর্তে এর মূল কারণ ও স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে হবে। প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে কার্যকর পদক্ষেপ এবং বাস্তুচ্যুতি সামলানোর পরিবর্তে তা বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রথম প্রস্তাবে তিনি রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানান। মিয়ানমারের ভেতরে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে তাদের প্রভাব কাজে লাগানোর কথাও বলেন তিনি।
দ্বিতীয় প্রস্তাবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসহ সব বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধের দাবি জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তৃতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত এবং পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারেক রহমান। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে স্থানীয় জনগণের উন্নয়ন যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
চতুর্থ প্রস্তাবে টেকসই প্রত্যাবাসনের সঙ্গে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিকে যুক্ত করার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে গাম্বিয়ার নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্তব্যবস্থার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার এবং গুরুতর অপরাধে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।
পঞ্চম প্রস্তাবে মাদকনির্ভর অর্থনীতি, মানব পাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্রসহ বিভিন্ন আন্তসীমান্ত অপরাধ দমনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দেন তারেক রহমান।
বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রাখতে চায় না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে অধিকার সুরক্ষিত রেখে তাদের মিয়ানমারের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হলে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ যেন নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির ধারাবাহিকতায় আটকে না থাকে; বরং ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার নতুন অধ্যায় দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ নির্মিত হওয়া উচিত। সেই পরিবর্তনের সূচনা এখনই হওয়া প্রয়োজন।
সদ্য সংবাদ/ এআর