জমির মূল্য ৬৩ কোটি, দলিলে ১৭ কোটি! ইবনে সিনা ফার্মা এমডির বিরুদ্ধে অভিযোগ

সদ্য সংবাদ ডেস্ক
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:৫০:০০
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মিরপুর হাউজিংয়ের পাইকপাড়া এলাকায় ২০ দশমিক ৮৩৩২৫ কাঠা জমির প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ৬৩ কোটি টাকা হলেও দলিলে তা ১৭ কোটি টাকা দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। বাকি ৪৬ কোটি টাকা নগদে বেআইনি লেনদেনের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে বলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।

এ ঘটনায় কোম্পানির সম্পত্তি আত্মসাৎ, জাল-জালিয়াতি, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি এবং অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলামসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে।

চকবাজার থানায় করা একটি মামলার তদন্ত শেষে সিআইডি প্রতিবেদনটি আদালতে জমা দেয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজশে বিভিন্ন ধরনের জাল ও ভুয়া নথি তৈরি এবং ব্যবহার করে কোম্পানির সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে, দারুস সালাম থানার মিরপুর হাউজিংয়ের পাইকপাড়া এলাকার প্লট নম্বর ২/বি-এর ওই জমির প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ছিল ৬৩ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট সম্পাদিত সাফ কবলায় জমিটির মূল্য দেখানো হয় ১৭ কোটি টাকা।

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃত লেনদেনের সঙ্গে দলিলে দেখানো মূল্যের পার্থক্য ৪৬ কোটি টাকা। এই অর্থ নগদে পরিশোধ করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই জমির মূল্য বিভিন্ন সময়ের দলিলে ভিন্নভাবে উল্লেখ করার বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে। সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারির একটি দলিলে জমিটির মূল্য দেখানো হয় ৪০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ৮ মার্চের দলিলে তা ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং একই বছরের ১৬ আগস্টের দলিলে ১৭ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালের ৩০ মে তারিখের দলিলে একই সম্পত্তির মূল্য দেখানো হয় মাত্র ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

সিআইডি বলেছে, প্রকৃত লেনদেন মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দলিলে উল্লেখ করার মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব পরিহারের অভিযোগের বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।

শুধু জমি বিক্রির মূল্য নিয়ে নয়, কোম্পানির শেয়ার ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে সিআইডি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা ১১ লাখ ১০ হাজারে উন্নীত করার পর মৃত শেয়ারহোল্ডারদের উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য শেয়ার দেওয়া হয়নি। বরং জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে ৫৪ হাজার ৫৩৬টি শেয়ার ২০১৭ সালের ৩১ মার্চ জেরিন আহমেদ ও মো. ফাহমিদের নামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কোম্পানির গঠনতন্ত্র, রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের (আরজেএসসি) নথি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাগজপত্র পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

তদন্ত প্রতিবেদনে সম্পত্তি বিক্রির অনুমোদনসংক্রান্ত নথি নিয়েও গুরুতর অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।

সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, কোম্পানির ২০ জন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে ১৫ জনের স্বাক্ষর জাল করে একটি বোর্ড রেজল্যুশন তৈরি করা হয়। পরবর্তী সময়ে ওই রেজল্যুশনের ভিত্তিতেই সম্পত্তি বিক্রি ও ক্রয়ের অনুমোদন নেওয়া হয়।

এ প্রক্রিয়ায় জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনপত্রও ব্যবহার করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পরে ২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট ৬৯৮৫ নম্বর সাফ কবলার মাধ্যমে সম্পত্তিটি হস্তান্তর করা হয়। সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাল ও প্রতারণামূলক নথি ব্যবহার করে সম্পত্তি হস্তান্তর ও দখলে রাখার অভিযোগের সত্যতা তদন্তে পাওয়া গেছে।

কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নথিপত্রেও জালিয়াতির অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছে সিআইডি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল একটি জাল হলফনামা এবং ভুয়া ও জাল অডিট রিপোর্ট তৈরি করা হয়। এসব নথি ব্যবহার করে একই বছরের ২৮ জুন কোম্পানিটি বন্ধ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিআইডি আরও জানিয়েছে, ওই সময় মামলার বাদী কানিজ ফাতেমা সেখানে উপস্থিত না থাকলেও তার স্বাক্ষর নকল করা হয়। একইভাবে কোম্পানির আটজন শেয়ারহোল্ডার ও মামলার সাক্ষীদের স্বাক্ষর জাল করার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিআইডির তদন্ত অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলামের সঙ্গে আলাউদ্দিন সুইটমিট লিমিটেডের একটি লিখিত চুক্তি হয়।

এরপর সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন নথি প্রস্তুত করা হয় এবং সম্পত্তি বিক্রির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তে কোম্পানির বিভিন্ন নথি, শেয়ার-সংক্রান্ত কাগজপত্র, সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল, হলফনামা, অডিট রিপোর্ট এবং সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা হয়েছে।

সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনের ১১ নম্বর পাতায় ছয় আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন—আলাউদ্দিন সুইটমিট লিমিটেডের চার পরিচালক সুফিয়া বেগম, জেরিন আহমেদ, মো. ফাহমিদ ও মো. মারুফ আহম্মদ; ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলাম এবং প্যানসিয়া সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান প্রফেসর চৌধুরী মাহমুদ হাসান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা পরস্পর যোগসাজশে কোম্পানির নগদ অর্থ ও সম্পদ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি ও ব্যবহার করেছেন এমন অভিযোগের সত্যতা তদন্তে পাওয়া গেছে।

ঘটনাটি নিয়ে ২০২৫ সালে চকবাজার থানায় সিআর মামলা নম্বর ৪৭৩/২০২৫ দায়ের করা হয়। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডির ঢাকা মেট্রো-দক্ষিণ।

তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক শাহজালাল মুন্সী মামলার নথি, লিখিত চুক্তি, কোম্পানির গঠনতন্ত্র, শেয়ার-সংক্রান্ত কাগজপত্র, সাফ কবলা, হলফনামা, অডিট রিপোর্ট, কোম্পানি বন্ধের নথি, সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করেন।

তদন্ত শেষে চলতি বছরের ২৯ জুলাই ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩১-এ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।

গত ৩ আগস্ট প্রতিবেদনটি নিয়ে আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আদালত সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে পরবর্তী আদেশ দেওয়ার কথা জানায়। পরে ২ সেপ্টেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছিল। তবে মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. একরামুল হক মজুমদার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় ওই তারিখে মামলার বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।

সূত্র: দৈনিক আমাদের মাতৃভুমি, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

সদ্য সংবাদ/এসএস

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্করের ৩ মামলায় জামিন সদ্য. আওয়ামী লীগের অপতৎপরতায় সরকার মোটেও শঙ্কিত নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য. কওমি মাদ্রাসায় শারীরিক শাস্তি বন্ধে শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা সদ্য. নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যাচ্ছেন ৩৫ সফরসঙ্গী সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে আবারও আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত সদ্য. নতুন ২ বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন, উৎপাদন হবে ২৬৪০ মেগাওয়াট সদ্য. পল্লবীতে দাঁড়িয়ে থাকা বাসে আগুন সদ্য. অপ্রতিমের বাবাকে ফোন করে সমবেদনা জানালেন জামায়াত আমির সদ্য. অপ্রতিম হত্যায় ৪ জন গ্রেপ্তার, স্বীকারোক্তি মিলেছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য. সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্করের ৩ মামলায় জামিন সদ্য. আওয়ামী লীগের অপতৎপরতায় সরকার মোটেও শঙ্কিত নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য. কওমি মাদ্রাসায় শারীরিক শাস্তি বন্ধে শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা সদ্য. নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যাচ্ছেন ৩৫ সফরসঙ্গী সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে আবারও আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত সদ্য. নতুন ২ বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন, উৎপাদন হবে ২৬৪০ মেগাওয়াট সদ্য. পল্লবীতে দাঁড়িয়ে থাকা বাসে আগুন সদ্য. অপ্রতিমের বাবাকে ফোন করে সমবেদনা জানালেন জামায়াত আমির সদ্য. অপ্রতিম হত্যায় ৪ জন গ্রেপ্তার, স্বীকারোক্তি মিলেছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী