হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাপড়ের রোলের ভেতর লুকিয়ে আনা ১ হাজার ৬৫৫টি মোবাইল ফোনের একটি চালান জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। জব্দ করা ফোনগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিমানবন্দরের এয়ার ফ্রেইট এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় একটি কাপড়ের চালান তল্লাশি করে রোল করা ফেব্রিকসের ভেতরের ফাঁকা অংশ থেকে বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। মঙ্গলবার রাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল-আমিন শেখ এক বার্তায় এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
শুল্ক গোয়েন্দার নথি পর্যালোচনায় জানা যায়, গত ৩১ আগস্ট হংকং থেকে ঢাকাগামী আরএইচ-৬৬৫১ ফ্লাইটে ৮৯৫ কেজি ওজনের ২০টি প্যাকেজ শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছায়। চালানটির মাস্টার এয়ারওয়ে বিল নম্বর ৮২৮-৫৬৭৮-২৪১২ এবং হাউস এয়ারওয়ে বিল নম্বর জেএলজি ৫৭২০৩।
নথিপত্রে চালানটির প্রেরক হিসেবে ঝেজিয়াং শাওশিং শিনহুয়া নিটিং কোম্পানির নাম পাওয়া গেছে। মাস্টার বিলে জ্যাঙ্কো গ্লোবাল লজিস্টিকস লিমিটেড এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনায় এফএফ কার্গো সার্ভিসের তথ্য রয়েছে।
চালানটি বাংলাদেশে আমদানির ক্ষেত্রে ‘থিয়ানিস অ্যাপারেলস লিমিটেড’ নামের একটি তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। কাগজপত্রে পণ্য হিসেবে ‘নিট ফেব্রিকস’ বা বোনা কাপড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু শুল্ক গোয়েন্দাদের তল্লাশিতে ঘোষণার আড়ালে মোবাইল ফোন লুকিয়ে আনার বিষয়টি ধরা পড়ে।
কর্মকর্তারা জানান, কাপড়ের রোলের ভেতরের ফাঁকা জায়গা কাজে লাগিয়ে ফোনগুলো এমনভাবে রাখা হয়েছিল, যাতে সাধারণভাবে দেখলে সেগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়। প্রাথমিক গণনায় উদ্ধার করা হয়েছে ১ হাজার ৬৫৫টি হ্যান্ডসেট।
উদ্ধার হওয়া ফোনের মধ্যে ৪৫০টি রেডমি ১৪সি এবং ১৫০টি রেডমি ১৫সি রয়েছে। বাকি ১ হাজার ৫৫টি ফোনের মধ্যে ব্যবহৃত আইফোনসহ বিভিন্ন চীনা ব্র্যান্ডের মোবাইল রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া পণ্যের এই বড় ধরনের পার্থক্য মিথ্যা ঘোষণা ও পণ্য গোপনের শামিল। এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ শুল্ক-কর ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে উদ্ধার করা প্রতিটি মোবাইলের মডেল, আইএমইআই নম্বর, ফোনগুলো নতুন নাকি ব্যবহৃত এবং এগুলোর ওপর প্রযোজ্য শুল্ক-কর নির্ধারণের কাজ চলছে। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
থিয়ানিস এপারেলসের পেছনের গল্প-
চট্টগ্রাম ইপিজেডের থিয়ানিস এপারেলস একসময় দেশের পোশাক খাতের আলোচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ছিল। প্রতিষ্ঠানটি মূলত উচ্চমূল্যের স্যুট তৈরি ও রপ্তানির জন্য পরিচিত ছিল। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অন্য অনেক কারখানা যেখানে তুলনামূলক কম দামের পোশাক রপ্তানি করত, সেখানে থিয়ানিসের তৈরি স্যুটের রপ্তানি মূল্য ছিল অনেক বেশি।
একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক রপ্তানি আয় শত কোটি টাকার বেশি ছিল বলেও দাবি করা হয়। উদ্যোক্তা আনিসুর রহমান খানের ব্যবসায়িক সাফল্য পোশাক খাতের অন্য উদ্যোক্তাদেরও উৎসাহিত করেছিল।
তবে ২০১৭ সালের একটি অগ্নিকাণ্ডে কারখানাটির বড় ধরনের ক্ষতি হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কায় সেই প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে কারখানার ভাড়া, শ্রমিকদের বকেয়া পাওনাসহ নানা আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা প্রতিষ্ঠানটির ওপর চাপ তৈরি করে।
তবে বিমানবন্দরে জব্দ হওয়া মোবাইলের চালানের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন থিয়ানিস এপারেলসের মালিক আনিসুর রহমান খান।
তিনি জানান, তার কারখানা প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। সাংবাদিকের কাছ থেকে চালান আটকের বিষয়টি জানার পর তিনি সংশ্লিষ্ট সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানটিও কাস্টমসের কাছ থেকে এ বিষয়ে বার্তা পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে। তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কোম্পানির কোনো কর্মচারী এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন।
এদিকে, জব্দ করা মোবাইল ফোনের চালানটি কীভাবে থিয়ানিস এপারেলসের নামে এসেছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং প্রকৃত আমদানিকারক কে এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে।
সদ্য সংবাদ/এসএস