সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জান্নাত আরা হেনরী ও তাঁর স্বামী শামীম তালুকদার লাবুর সম্পদ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একসময় বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকতা করা হেনরী ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত হলেও পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসেন। ২০০৯ সালে সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক ও আর্থিক অবস্থানে বড় পরিবর্তন আসে বলে বিভিন্ন নথি ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
নির্বাচনী হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৮ সালে জান্নাত আরা হেনরী ও তাঁর স্বামীর নামে যে সম্পদের হিসাব দেওয়া হয়েছিল, ১৫ বছর পর তা বহুগুণ বেড়েছে। ২০০৮ সালের হলফনামায় হেনরীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা। আর ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় তাঁর নিজের সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয় ৫৬ কোটি ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৬০২ টাকা। একই সময়ে তাঁর স্বামী শামীম তালুকদার লাবুর সম্পদ ৭ লাখ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
সিরাজগঞ্জ সদরের সদানন্দপুর এলাকার স্কুলশিক্ষক আবদুল হামিদ মিঞার মেয়ে জান্নাত আরা হেনরী। ১৯৮৮ সালে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত মোতাহার হোসেন তালুকদারের ছেলে শামীম তালুকদার লাবুর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
পরবর্তীতে সিরাজগঞ্জ শহরের সবুজ কানন স্কুল অ্যান্ড কলেজে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন হেনরী। রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হিসেবেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে। শ্বশুরবাড়ির রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সূত্র ধরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। একপর্যায়ে কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরে সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদেও দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান জান্নাত আরা হেনরী। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর কাছে তিনি পরাজিত হন।
এরপর ২০০৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা প্রয়াত এইচ টি ইমামের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথা রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়। ওই সময় তাঁকে সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য করা হয়।
হেনরী পরিচালনা পর্ষদের সদস্য থাকাকালে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে বহুল আলোচিত হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদের জবানবন্দিতে ব্যাংকের কয়েকজনের ঘুস নেওয়ার অভিযোগের কথা উঠে এলেও হেনরীসহ পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যকে পরে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০০৮ সালের নির্বাচনী হলফনামায় হেনরী তাঁর বার্ষিক আয় ১ লাখ ২২ হাজার টাকা দেখিয়েছিলেন। এর মধ্যে কৃষি খাত থেকে আয় ছিল ২ হাজার টাকা। শিক্ষকতা, চিকিৎসা ও আইনি পরামর্শসহ অন্যান্য পেশা থেকে আয় দেখানো হয়েছিল ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। একই সময়ে ব্যয় দেখানো হয় ৮০ হাজার টাকা।
তখন তাঁর হাতে নগদ ছিল আড়াই লাখ টাকা। স্বামী লাবুর নগদ অর্থ ছিল ২ লাখ টাকা। হেনরীর নামে সাড়ে ১৭ শতক কৃষিজমি ও ৩৬ শতক অকৃষি জমি ছিল। লাবুর নামে ছিল ৩ বিঘা কৃষিজমি এবং সাড়ে ৬ শতক অকৃষি জমি। হেনরীর নামে ২০ ভরি স্বর্ণালংকার থাকার তথ্যও হলফনামায় দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের হলফনামায় হেনরী ও লাবুর আয়-সম্পদের চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। সেখানে কৃষি, দোকান ভাড়া, ব্যবসা, চাকরি ও সম্মানী, ডেইরি-ফিশারি এবং ব্যাংক মুনাফাসহ বিভিন্ন খাতে আয় দেখানো হয়। দুইজনের আয়সহ সম্পদের পরিমাণ ৬৬ কোটি ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৩০৭ টাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
হলফনামায় হেনরীর কৃষি খাতে বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকা, তিনটি দোকান ভাড়া থেকে ৮ লাখ ৯১ হাজার টাকা, ব্যবসা থেকে ৪ কোটি ৪৭ লাখ ২৫ হাজার ২৯৬ টাকা, চাকরি ও সম্মানী বাবদ ২৮ লাখ ১৩ হাজার ৭৯৯ টাকা এবং ডেইরি-ফিশারি ও ব্যাংক মুনাফা বাবদ ৩ কোটি ২৬ লাখ ২৪ হাজার ৬৬১ টাকা দেখানো হয়।
হলফনামা অনুযায়ী, হেনরীর নামে ১ হাজার ৩৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ কৃষিজমি রয়েছে, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। তাঁর স্বামীর নামে রয়েছে ৫২১ দশমিক ৫৪ শতাংশ কৃষিজমি, যার মূল্য ৭৩ লাখ ৬৯ হাজার টাকা।
হেনরীর নামে ১৯০ দশমিক ৭৫ শতাংশ অকৃষি জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৮৭ লাখ ৫ হাজার টাকা। লাবুর নামে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ১০০ শতাংশ অকৃষি জমির তথ্য রয়েছে।
হেনরীর নামে চারটি ভবনের মূল্য দেখানো হয়েছে ৫ কোটি ২২ লাখ ১৪ হাজার টাকা। আর স্বামী লাবুর নামে একটি দালানের মূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
এ ছাড়া হেনরীর নামে নগদ অর্থ ছিল ২২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৫ টাকা এবং লাবুর নামে ২২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৩৫ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হেনরীর নামে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৭৩ হাজার ৭৪০ টাকা এবং লাবুর নামে ১ কোটি ২০ লাখ ৮৫ হাজার ৭৩৫ টাকা জমা থাকার তথ্য হলফনামায় রয়েছে।
হেনরীর নামে বন্ড, ঋণপত্র ও বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার বাবদ ২ কোটি ৩৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকার বিনিয়োগ দেখানো হয়েছে। তাঁর সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ রয়েছে ৩৩ কোটি ৪৯ লাখ ২৯ হাজার ৭৬৭ টাকা। একই খাতে লাবুর বিনিয়োগ ১ কোটি ৩ লাখ ২৯ হাজার ৭৬১ টাকা।
যানবাহনের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের সম্পদের তথ্য রয়েছে। হেনরীর নামে থাকা যানবাহনের মূল্য ৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং লাবুর নামে থাকা যানবাহনের মূল্য ২ কোটি ১৫ লাখ ৯৮ হাজার ১৫৬ টাকা দেখানো হয়েছে।
হেনরী ও তাঁর পরিবারের নামে সিরাজগঞ্জের পাশাপাশি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, পটুয়াখালী ও গাজীপুরে জমি, ভবন ও অন্যান্য স্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ শহরের মুজিব সড়কে শ্বশুর প্রয়াত মোতাহার হোসেন তালুকদারের বাড়িতে বসবাস করেন হেনরী। বাড়িটি আধুনিকায়নের পাশাপাশি এর পাশে একটি সাততলা আবাসিক ভবন নির্মাণের তথ্য রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ সদরের বাহুকা-রতনকান্দি এলাকায় কয়েকটি জমি ও ভবনের পাশাপাশি পূর্ব মোহনপুর, শিলন্দা, বনবাড়ীয়া, সদানন্দপুর ও ভারাঙ্গা এলাকায় বিভিন্ন দলিলে জমি কেনার তথ্য আয়কর নথিতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। রায়গঞ্জেও তাঁর জমি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকার মিরপুরে রজনীগন্ধা কমপ্লেক্সে দুটি ফ্ল্যাট, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে কয়েকটি প্লট এবং পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় ২ দশমিক ৫১ একর জমির তথ্যও উঠে এসেছে।
সিরাজগঞ্জ ও গাজীপুরে হেনরীর নামে একাধিক প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জ সদরের নলিছাপাড়ায় রয়েছে জান্নাত আরা হেনরী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কলেজ এবং হেনরী ইনস্টিটিউট অব বায়োসায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি।
শহরের ফজল খান রোডে রয়েছে হেনরী স্কলাস্টিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজ। গজারিয়া এলাকায় প্রায় ১২ বিঘা জমিতে ‘কিছুক্ষণ’ নামে রিসোর্ট ও কেবল তৈরির কারখানা গড়ে তোলার তথ্য রয়েছে।
এর কাছেই প্রায় ১৬ বিঘা জমিতে ৫৬ কক্ষের বৃদ্ধাশ্রম ‘হেনরীর ভুবন’ প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই এলাকায় তাঁর শ্বশুরের নামে মোতাহার হোসেন হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার তথ্য রয়েছে।
গাজীপুরের শ্রীপুরে দুটি রিসোর্ট, বড় গরুর খামার, সিরাজগঞ্জ শহরের স্টেশন রোডে জুবলী প্লাজা, মুজিব সড়কে রাস মেডিকেয়ার এবং সয়দাবাদ কড্ডার মোড় এলাকায় বহুতল বাণিজ্যিক ভবনের তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে। এ ছাড়া মিয়া আয়রন অ্যান্ড স্টিলসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
হেনরী দম্পতির ব্যবহৃত একাধিক বিলাসবহুল গাড়ির তথ্যও উঠে এসেছে। এর মধ্যে ল্যান্ড ক্রুজারসহ কয়েকটি ব্যক্তিগত গাড়ির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সিরাজগঞ্জের নর্থ-ওয়েস্ট জেনারেশন কোম্পানির আওতাধীন যমুনা সেতু পশ্চিম সয়দাবাদ পাওয়ার প্ল্যান্ট, ভেড়ামারা পাওয়ার প্ল্যান্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাড়ায় চলা শতাধিক মাইক্রোবাসের সঙ্গে হেনরী দম্পতির স্বজনদের সম্পৃক্ততার দাবি করা হয়েছে। এসব গাড়ির বড় অংশ স্বজনদের নামে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জান্নাত আরা হেনরীর সম্পদ ও আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানের তথ্য সামনে আসে। ওই অনুসন্ধানে তাঁর আয়কর নথিতে উল্লেখ না থাকা প্রায় ৫৭ কোটি ১৩ লাখ টাকার সম্পদের কথা এবং ৩৫টি ব্যাংক হিসাবে ২ হাজার ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৩ কোটি ৭৮ লাখ ডলার অর্থপাচারের তথ্য পাওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হেনরী ও লাবুর বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জ সদর থানায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় যুবদল ও ছাত্রদলের তিন নেতার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তিনটি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া অস্ত্র আইনে একটি মামলা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে দুটি মামলা থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজার থেকে স্বামী শামীম তালুকদার লাবুসহ হেনরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তাঁরা কারাগারে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লাইসেন্স করা অস্ত্র জমা না দেওয়ার অভিযোগেও তাঁদের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা হয়েছে।
জান্নাত আরা হেনরীর সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু।
তিনি বলেন, হেনরী একসময় নির্ধারিত বেতনে বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর সম্পদ যেভাবে বেড়েছে, তা সাধারণ মানুষের কাছে স্বাভাবিক মনে হয় না। সোনালী ব্যাংকের পরিচালক থাকা এবং হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে তাঁর সংশ্লিষ্টতার যে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোও তদন্তের দাবি রাখে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাচ্চুর দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা উচিত।
সদ্য সংবাদ/এসএস