সমাজসেবা অধিদপ্তরের সদর কার্যালয়ে সরকারি অর্থ ব্যয় ও পণ্য-সেবা কেনাকাটার প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন নথি ও হিসাব পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রায় ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৬ হাজার টাকার ব্যয় নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে অধিদপ্তরের দুই সহকারী পরিচালক মো. কামরুল হাসান সরকার ও মো. ফিরাদুল হকের নাম উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ক্রয়ের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ না করে একই ধরনের কাজ বা কেনাকাটা একাধিক ভাগে বিভক্ত করে কোটেশন পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি সরাসরি ভাউচার ব্যবহার করে বিপুল অর্থ ব্যয় এবং আগের অর্থবছরের কিছু বিল পরবর্তী সময়ে পরিশোধের ঘটনাও তদন্তের দাবি রাখে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নথিপত্রে RFQ পদ্ধতিতে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার টাকা ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিভিন্ন কাজকে ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। নিউ বাকেরগঞ্জ ডেকোরেটর, ক্যাপিটাল ইলেকট্রিক, আরজে কনস্ট্রাকশন, সেলভিশন সিস্টেমস ও আফরিন এন্টারপ্রাইজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক কাজ দেওয়ার বিষয়টিও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে শুধু RFQ খাতে মোট কত টাকা ব্যয় হয়েছে এ তথ্যের ভিত্তিতে বিধি লঙ্ঘন নিশ্চিত করা যায় না। কারণ ক্রয়ের ধরন, বাজেটের উৎস, পণ্য বা সেবার প্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট অর্থবছর অনুযায়ী বিধিমালার সীমা পৃথক হতে পারে। তাই প্রতিটি ক্রয়ের নথি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সরাসরি ভাউচার ও নগদ ক্রয়ের হিসাব নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন খাতে ভাউচারের মাধ্যমে ২ কোটি ১৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। কম্পিউটার সরঞ্জাম, সেমিনারসামগ্রী, আপ্যায়ন, জ্বালানি, পরিচ্ছন্নতা উপকরণ ও যানবাহন মেরামতের মতো খাতে এসব ব্যয়ের তথ্য রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া আগের অর্থবছরের প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার কিছু বিল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব বিল এক পর্যায়ে হিসাবরক্ষণ কার্যালয় থেকে ফেরত যাওয়ার পর পরবর্তী অর্থবছরে পুনরায় উপস্থাপন করে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু অর্থ মো. কামরুল হাসান সরকারের পাওনা হিসেবে দেখানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব এসব বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, আগের অর্থবছরের বকেয়া বিলগুলো কোনো অনিয়মের কারণে আটকে ছিল না; বরং বরাদ্দের সীমাবদ্ধতার কারণে সেগুলো পরবর্তী অর্থবছরে দায় হিসেবে বহন করা হয়। পরে সরকারি বিধান ও জিএফআর অনুসরণ করেই সেগুলো নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
RFQ খাতে ব্যয়ের বিষয়েও মহাপরিচালক জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সময়ে প্রচলিত বিধিমালা অনুসরণ করেই বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে RFQ-এর ব্যবহার কমিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র বা OTM পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান তিনি।
কাজ খণ্ডিত করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও নাকচ করেছেন মহাপরিচালক। তাঁর ভাষ্য, প্যাকেজ বিভাজন এড়াতে কয়েকটি কাজ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলকভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে নতুন করে RFQ-তে কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে মো. কামরুল হাসান সরকার জানান, তিনি গত অর্থবছরের ডিসেম্বর মাসে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে যোগ দেন। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের সময় ও নথিপত্রে থাকা ব্যয়ের সময়কাল যাচাই করলেই তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সব অভিযোগ মিলিয়ে প্রায় ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৬ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়মের যে হিসাব সামনে এসেছে, তার মধ্যে RFQ খাতে ৩ কোটি ১৯ লাখ ১২ হাজার টাকা, ভাউচারভিত্তিক ব্যয়ে ২ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং আগের অর্থবছরের ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে এসব অর্থকে চূড়ান্তভাবে আত্মসাৎ বা দুর্নীতির অর্থ হিসেবে নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট কার্যাদেশ, দরপত্র ও কোটেশন, সরবরাহের প্রমাণ, বিল-ভাউচার, হিসাবরক্ষণ নথি এবং অডিট প্রতিবেদন যাচাই করা জরুরি।
সরকারি অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খতিয়ে দেখে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় আরও কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
সদ্য সংবাদ/এসএস