রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক কেনাবেচার বিস্তারের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, উদ্যানের কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় খুচরা মাদক বিক্রির সঙ্গে একাধিক চক্র জড়িত। তাদের মধ্যে আনিকা ও তার স্বামী নাহিদের নেতৃত্বে একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে উদ্যানের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, ফুল ক্যান্টিন, রমনা কালী মন্দির এবং মন্দিরসংলগ্ন পুকুরপাড়সহ কয়েকটি জায়গায় প্রকাশ্যে ও আড়ালে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব এলাকায় বিভিন্ন পরিমাণে গাঁজা ছোট ছোট প্যাকেটে বিক্রি করা হয়।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আনিকা নামের ওই নারী দীর্ঘদিন ধরে উদ্যানকেন্দ্রিক মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি অন্তঃসত্ত্বা। অভিযোগ রয়েছে, শারীরিক এই অবস্থাকে ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিন পর্যবেক্ষণে আরও জানা যায়, আনিকার সঙ্গে কয়েকজন নারী খুচরা বিক্রেতার যোগাযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে বৃষ্টি, নাসরিন, সেলিনা, কুলসুম, তানিয়া ও পুতুলের নাম এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট সময় ও এলাকায় এসব বিক্রেতাদের কাছে মাদক পৌঁছে দেওয়া হয়।
এদিকে, আনিকার স্বামী নাহিদকে এই নেটওয়ার্কের নেপথ্যের সমন্বয়কারী হিসেবে দাবি করেছেন কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে আরও কয়েকটি পৃথক চক্রের অস্তিত্বের কথাও জানা গেছে। হিজড়া সুমন, ডিস কালু, ইব্রাহিম ও নাছুরের নাম উঠে এসেছে এসব অভিযোগে। তাদের প্রত্যেকের অধীনে কয়েকজন করে খুচরা বিক্রেতা বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিক্রি করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এর আগে তানজিলা নামের এক নারী মাদক কারবারি গ্রেপ্তার হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে তার স্বামী হৃদয় এখনও উদ্যানের বিভিন্ন স্থানে মাদক কেনাবেচা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, পুলিশি তৎপরতার খবর ছড়িয়ে পড়লে সন্দেহভাজন কয়েকজন দ্রুত উদ্যানের বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে সরে যান। টিএসসি সংলগ্ন গেট বন্ধ থাকায় কেউ কেউ দেয়াল টপকে বাইরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে দেখা গেছে। অভিযানের খবর কীভাবে আগেই তাদের কাছে পৌঁছে যায়, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মাদক কারবারের পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের দায়িত্ব পালনে বাধা ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, উদ্যানের মাদক কারবার নিয়ে ছবি বা ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে কয়েকজন ব্যক্তি সাংবাদিকদের বাধা দেন।
উদ্যানের পরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন দর্শনার্থী ও শিক্ষার্থীরাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, পরিবার কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে এসে মাদকের গন্ধ ও প্রকাশ্য কেনাবেচা দেখতে হচ্ছে। এতে ঐতিহাসিক এই স্থানের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
সাভার থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা কামরুল হাসানের ভাষ্য, শিশুদের সামনে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হলে সেটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারা এই ব্যবসা পরিচালনা করছে এবং তাদের পেছনে কারা রয়েছে, তা খুঁজে বের করার দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নিরাপত্তা ও মাদকবিরোধী কার্যক্রমে পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে। অপরাধীরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করলেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা চক্রের বিরুদ্ধে তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ জানান, উদ্যানের মতো উন্মুক্ত স্থানে মাদক বিক্রির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সদ্য সংবাদ/এসএস