দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে বড় ধরনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে দেশে নতুন করে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পাশাপাশি গভীর সমুদ্রে আরও একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে সরকারের জ্বালানি পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদ গ্যাস সরবরাহে আকস্মিক সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে জানতে চান, ভবিষ্যতে এলএনজি টার্মিনাল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে শিল্পকারখানায় যাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে জন্য বিকল্প ব্যবস্থা, মজুত সক্ষমতা ও জরুরি সরবরাহ পরিকল্পনা নেওয়া হবে কি না।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্র চিহ্নিত করতে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক জরিপ পরিচালনার কাজ চলছে।
বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এসব টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়। ভবিষ্যৎ চাহিদা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াতে মহেশখালীর কুতুবজোমে আরেকটি ভাসমান টার্মিনাল এবং মাতারবাড়িতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সরকারপ্রধান জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী কুতুবজোমের নতুন ভাসমান টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ির স্থলভিত্তিক টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি পায়রা, মোংলা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় গভীর সমুদ্রে আরেকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
সংসদে ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে ভোলার গ্যাস ব্যবহারের পরিকল্পনাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে নিতে গেলে অন্তত সাত বছর সময় লাগতে পারে। তাই দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণের পাশাপাশি ভোলাতেই গ্যাস ব্যবহার করে শিল্পায়নের দিকে সরকার বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ভোলায় গ্যাসনির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। স্থানীয়ভাবে গ্যাস ব্যবহার করে শিল্পকারখানা স্থাপন করা গেলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি ভোলার অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
এ পরিকল্পনার আওতায় ভোলায় একটি বড় সার কারখানা এবং ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও সংসদে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভারসাম্য, স্থানীয় সম্পদ, মানুষের প্রয়োজন, জলবায়ু ঝুঁকি ও অবকাঠামোগত বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
এদিকে দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে নবায়নযোগ্য উৎসের ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে সৌরবিদ্যুৎসহ পরিবেশবান্ধব উৎস সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
সরকারের জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সৌরবিদ্যুৎকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন ভবন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং বড় ভূমিভিত্তিক সৌরপ্রকল্প থেকে আরও ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি বায়ু বিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ এবং কৃষির সঙ্গে সমন্বিত সৌরপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও প্রয়োজনীয় কাঠামো আমদানিতে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে নতুন মূল্য কাঠামো চালু করা হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাটারিসহ রুফটপ সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনের সর্বোচ্চ ব্যয় প্রতি ইউনিট ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত প্রণোদনা ও মুনাফা যুক্ত করে জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রির মূল্য প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নেট মিটারিং নির্দেশিকা ২০২৫ অনুসরণ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরব্যবস্থা স্থাপনকারী গ্রাহকেরা নিজস্ব ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে নির্ধারিত হারে তিন বছর পর্যন্ত সুবিধা পাবেন।
সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিভিন্ন নীতিমালা ও নির্দেশিকাও কার্যকর করা হয়েছে। রুফটপ সোলার কর্মসূচি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, অনশোর উইন্ড গাইডলাইন এবং কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাপনার মতো উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
সদ্য সংবাদ/এসএস