রাজধানীর মধ্য বাড্ডার বেপারিপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মেহেদী হাসান ওরফে দীপুকে গ্রেপ্তার করেছে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর একটি বিশেষ দল। পুলিশ জানায়, বাড়িটি মেহেদী হাসানেরই। ওই বাড়ির তিনতলার একটি ফ্ল্যাট থেকে ১১টি অত্যাধুনিক বিদেশি অস্ত্র ও ৩৯৪টি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের বাড্ডা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার আসাদুজ্জামান জানান, শুক্রবার অস্ত্র ও গুলিসহ মেহেদী হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে এবং আদালত তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মেহেদী হাসান দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের হয়ে রামপুরা, বনশ্রী, বাড্ডা, ভাটারা, বারিধারা ও গুলশান এলাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন। তাঁর ও তাঁর সহযোগীদের কাছে আরও অস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। এসব অস্ত্র মূলত সুব্রত বাইন ও আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদের। গত বছরের মে মাসে কুষ্টিয়া শহরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেন মেহেদী হাসান।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রেপ্তার মেহেদী হাসান সুব্রত বাইনের সহযোগী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বাড্ডা ও ভাটারাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিক্রি করে আসছিলেন।
নব্বইয়ের দশকে ঢাকার অপরাধজগতের আলোচিত নাম ছিল সুব্রত বাইন। আধিপত্য বিস্তার, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির সঙ্গে তাঁর নাম নিয়মিতভাবে জড়িত ছিল। এসব কার্যক্রম ঘিরে অসংখ্য খুন ও জখমের ঘটনাও ঘটেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুব্রত বাইনের সহযোগী হিসেবে মেহেদী হাসানের পাশাপাশি ওয়াসির মাহমুদ সাঈদ ওরফে বড় সাঈদ, গোলাম মর্তুজা বাবু ওরফে মধু বাবু এবং সোহেল ওরফে কান্নি সোহেল কাজ করতেন। গত এক বছরে তাঁরা একাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলে পুলিশের দাবি। এর মধ্যে গত বছরের ২০ মার্চ গুলশানের পুলিশ প্লাজার সামনে ইন্টারনেট ব্যবসায়ী সুমনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ওয়াসির মাহমুদ সাঈদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, মেহেদী হাসানের সঙ্গে বাড্ডা ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. জাহাঙ্গীর আলম ও তাঁর ভাই আলমগীরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
পুলিশ আরও জানায়, ৫ আগস্টের পর প্রকাশ্যে এসে সুব্রত বাইন প্রতিবেশী দেশ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করেন এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন। মেরুল বাড্ডার একটি আবাসিক এলাকার ভেতরের মাছের আড়ত থেকে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের চাঁদা তুলতেন। সুব্রত বাইন গ্রেপ্তার হওয়ার পর ওই আড়তসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চাঁদাবাজি ও ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন মেহেদী হাসান।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, মেহেদী হাসান ও তাঁর সহযোগীরা বাড্ডা ও ভাটারাসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাড়াটে খুনি হিসেবেও কাজ করতেন এবং অন্য সন্ত্রাসীদের কাছে অস্ত্র ভাড়া দিতেন। সুব্রত বাইনের অস্ত্রগুলোর একটি বড় অংশ মেহেদী হাসান ও মধু বাবুর কাছে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত ১৯ এপ্রিল রাতে হাতিরঝিল থানাধীন নয়াটোলা মোড়ল গলির ‘দি ঝিল ক্যাফে’র সামনে যুবদল নেতা মো. আরিফ সিকদারকে গুলি করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ হত্যাকাণ্ডে সুব্রত বাইনের সহযোগীরা জড়িত ছিল বলে পুলিশ দাবি করে। মামলাটির তদন্তে সুব্রত বাইনের মেয়ে খাদিজা ইয়াসমিনকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
ডিবি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সুব্রত বাইন কুমিল্লার কারাগারে রয়েছেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করে খাদিজা ইয়াসমিন বিভিন্ন সময়ে মেহেদী হাসান ও অন্য সহযোগীদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতেন।
গ্রেপ্তারের সময় উত্তর বাড্ডার ওই বাড়ি থেকে অস্ত্র ও গুলির পাশাপাশি পিস্তলের আটটি ম্যাগাজিন, ৩২টি কার্তুজ, একটি ২২ উজি মেশিনগান রাইফেল, উজি রাইফেলের দুটি ম্যাগাজিন, তিনটি চায়নিজ কুড়াল, একটি টাইগার হান্টিং কমান্ডো চাকু, দুটি ওয়াকিটকি, একটি ওয়াকিটকি ব্যাটারি, তিনটি পিস্তলের সাইড কভার ও একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল উদ্দীন অস্ত্র আইনের মামলায় মেহেদী হাসান দীপুকে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক কামাল হোসেন জানান, তদন্ত কর্মকর্তা সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলেও শুনানি শেষে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, দীপু ও তাঁর সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে বাড্ডা-ভাটারা থানা এলাকাসহ মহানগরের বিভিন্ন স্থানে গোপনে অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচা চালিয়ে আসছিলেন। মামলার মূল রহস্য উদঘাটন এবং পলাতক আসামিদের শনাক্ত করতে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।