ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত করে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে পড়েছে ইউরোপের তেল শোধনাগারগুলোতে। সরবরাহ সংকটের কারণে ইউরোপের কয়েকটি শোধনাগারে নির্ধারিত অপরিশোধিত তেলের চালান বাতিল বা স্থগিত করেছে সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) তিনটি পৃথক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সূত্রগুলো বলেছে, সেপ্টেম্বরের জন্য নির্ধারিত কিছু তেল সরবরাহ বাতিলের বিষয়টি ইউরোপের কয়েকটি শোধনাগারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে সৌদি আরব।
তবে এ বিষয়ে সৌদি আরামকো এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
লন্ডনভিত্তিক জ্বালানি তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আর্গাস মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের অন্তত তিনটি বড় তেল শোধনাগারের সৌদি চালান ইতোমধ্যে পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। কিছু চালান আবার সেপ্টেম্বরের শেষ ১০ দিনের পরিবর্তে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আর্গাসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আরও অন্তত দুটি শোধনাগারকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত চালান বিলম্বিত বা বাতিল করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হতে পারে।
একটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ ১০ দিনে সৌদি আরব থেকে যেসব কার্গো বোঝাই হওয়ার কথা ছিল, সেগুলোও বাতিল হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমানে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে প্রায় পাঁচ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো সৌদি অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে আরামকো সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি।
জাহাজ চলাচল-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দরে তেল বোঝাই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। দেশটির পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে ড্রোন হামলার চার দিন পর এ পরিস্থিতি তৈরি হয়। পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র থেকে ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহনের প্রধান পথ এই পাইপলাইন। হামলার পর সেটির কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
ইউরোপে সৌদি তেলের চালান ব্যাহত হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দিনে ৭০ লাখ ব্যারেল পরিবহনে সক্ষম ইস্ট-ওয়েস্ট ক্রুড অয়েল পাইপলাইনের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর সামরিক হামলার পর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ এই পাইপলাইনের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
তবে পাইপলাইনে হামলার আগেই লোহিত সাগরে সৌদি তেল পরিবহনে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। গত সপ্তাহে আরামকো কয়েকজন ইউরোপীয় গ্রাহককে জানিয়েছিল, মিশরের সিদি কেরির টার্মিনাল থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকের কিছু রপ্তানি অন্তত দুই সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারে ধারাবাহিক হামলার কারণেই লোহিত সাগরে এই প্রাথমিক সংকট তৈরি হয়েছিল। পরে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে অপরিশোধিত তেল ইয়ানবু বন্দরে নেওয়া হয়। এরপর তেল যায় মিশরের আইন সুখনা বন্দরে। সেখান থেকে দৈনিক ২৫ লাখ ব্যারেল পরিবহন ক্ষমতাসম্পন্ন সুমেদ পাইপলাইনের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের সিদি কেরি টার্মিনালে পৌঁছায়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্ম ভর্টেক্সার তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহে সিদি কেরি টার্মিনাল থেকে সৌদি অপরিশোধিত তেল রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রতিদিন প্রায় ১৯ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল। একই সময়ে আইন সুখনা বন্দরে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল সৌদি তেল পৌঁছেছে।
তবে ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ইয়ানবু বন্দর থেকে নতুন করে কোনো সৌদি অপরিশোধিত তেলের চালান পাঠানো সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তার কারণে কিছু ট্যাংকার এআইএস ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে চলাচল করায় বিদ্যমান পরিসংখ্যানে সেসব জাহাজের তথ্য নাও থাকতে পারে।
এ অবস্থায় অক্টোবরের তেল বরাদ্দের বিষয়ে আরামকোর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন ইউরোপের মেয়াদী গ্রাহকেরা। সাধারণত যে মাসে তেল লোড করা হবে, তার আগের মাসের ১০ তারিখের মধ্যে এই বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়ে থাকে।
সৌদি তেল সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ইউরোপের ক্রেতারাও বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেছেন। পোল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান অরলেনের মতো দীর্ঘমেয়াদি বড় গ্রাহকেরা জরুরি চাহিদা পূরণে স্পট মার্কেট থেকে সরাসরি তেল কেনার পরিমাণ বাড়িয়েছে।
অরলেন গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ভূমধ্যসাগর, উত্তর সাগর ও পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন গ্রেডের অপরিশোধিত তেল সংগ্রহের জন্য অন্তত আটটি নতুন দরপত্র আহ্বান করেছে।
সদ্য সংবাদ/ এআর