‘তারা কেবল হত্যা করে গেছে’: ইরানের বিক্ষোভ দমনাভিযান প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:২৭

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরস্ত্র মানুষের ওপর সরাসরি গুলি চালানো হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে কেবল স্লোগান দেওয়ার কারণেই মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। পরিস্থিতিকে তারা ‘একতরফা যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা এই দমন-পীড়নের কথা প্রকাশ্যে এনেছেন, তাদের একজন দক্ষিণ ইরানের এক বাসিন্দা, যাকে নিরাপত্তার কারণে ‘ওমিদ’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। চল্লিশোর্ধ্ব এই ব্যক্তি জানিয়েছেন, গত কয়েকদিন ধরে নিজের শহরের রাস্তায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।

ওমিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনী কালাশনিকভ ধরনের অস্ত্র দিয়ে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তিনি বলেন, নিজের চোখে দেখেছেন কীভাবে বিক্ষোভকারীদের লাইনের দিকে সরাসরি গুলি ছোড়া হয়েছে এবং মানুষ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই লুটিয়ে পড়েছে। তার কথায়, খালি হাতে মানুষ একটি বর্বর শাসনব্যবস্থার মুখোমুখি হয়েছে।

তেহরানের এক তরুণী প্রত্যক্ষদর্শী গত বৃহস্পতিবারের পরিস্থিতিকে ‘কেয়ামত’ বা বিচার দিবসের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ওই দিন রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। কিন্তু পরদিন নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান কেবল হত্যাযজ্ঞে পরিণত হয়। নিজের চোখে সেই দৃশ্য দেখে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে জানান। তার ভাষায়, তেহরান এখন যুদ্ধক্ষেত্র, তবে এটি একতরফা যুদ্ধ—একদিকে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী, অন্যদিকে কেবল স্লোগান দেওয়া নিরস্ত্র মানুষ।

তেহরানের পশ্চিমের ফারদিস শহরের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গত শুক্রবার রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের অধীন প্যারামিলিটারি বাহিনী বাসিজের সদস্যরা হঠাৎ করেই বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালায়। ইউনিফর্ম পরা এসব সদস্য মোটরসাইকেলে করে এসে তাজা গুলি ছোড়ে। পাশাপাশি চিহ্নবিহীন গাড়ি গলিপথে ঢুকে পড়ে এবং সেখান থেকেও গুলি চালানো হয়, এমনকি যারা বিক্ষোভে অংশ নেয়নি তাদের দিকেও।

একজন প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, প্রায় প্রতিটি গলিতেই দুই বা তিনজন করে গুলিতে নিহত হয়েছে। বিবিসি পার্সিয়ানে কথা বলা প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ইরানের ভেতরের বাস্তবতা বাইরের দুনিয়ার পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বিভিন্ন শহরে নিহতের সংখ্যা শত শত থেকে হাজার হাজার হতে পারে। ইরান সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো হিসাব প্রকাশ না করলেও মঙ্গলবার এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, নিহতের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার হতে পারে, যার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছে। তিনি মৃত্যুর জন্য সন্ত্রাসীদের দায়ী করেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালে শতাধিক নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন এবং বিক্ষোভকারীদের দাঙ্গাকারী আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে তারা মসজিদ ও ব্যাংকে আগুন দিয়েছে।

বিবিসি পার্সিয়ানে পাঠানো ভিডিও ও তথ্য মূলত তেহরান, কারাজ, রাসত, মাশহাদ ও সিরাজের মতো বড় শহরগুলো থেকে এসেছে, যেখানে স্টারলিংক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কিছুটা ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। ছোট শহরগুলোতে ইন্টারনেট সীমিত থাকায় সেখানকার তথ্য পাওয়া কঠিন।

তবে বিভিন্ন শহর থেকে পাওয়া বর্ণনার ধারাবাহিকতা ও মিল থেকেই দমনাভিযানের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়েছে। বিবিসির সঙ্গে কথা বলা নার্স ও চিকিৎসাকর্মীরা জানিয়েছেন, তারা অসংখ্য মৃতদেহ ও গুরুতর আহত বিক্ষোভকারী হাসপাতালে আসতে দেখেছেন। অনেক হাসপাতালে জায়গার অভাবে আহতদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি। আহতদের বেশিরভাগেরই মাথা ও চোখে গুলির আঘাত ছিল।

কিছু প্রত্যক্ষদর্শী লাশ স্তূপ করে রাখার দৃশ্য দেখার কথাও জানিয়েছেন। রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তেহরানের কাহরিজাক ফরেনসিক সেন্টারে লাশের সারি ও স্বজনদের আহাজারি দেখা গেছে। মাশহাদের এক মর্গকর্মী জানিয়েছেন, শুক্রবার ভোরে মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত প্রায় দুই শতাধিক মৃতদেহ সেখানে আনা হয়েছিল এবং দ্রুত দাফন করা হয়।

রাসত শহরের এক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, বৃহস্পতিবার ৭০ জন নিহত বিক্ষোভকারীর লাশ হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়েছিল এবং স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তরের আগে নিরাপত্তা বাহিনী ‘বুলেটের দাম’ দাবি করেছে। পূর্ব তেহরানের এক হাসপাতালের চিকিৎসাকর্মীও জানিয়েছেন, সেদিন সেখানে প্রায় ৪০টি লাশ আনা হয়েছিল।

এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ইরানে সহিংসতা ও অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহারের ঘটনায় হতবাক হওয়ার কথা জানান। মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত মাই সাতোও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের কয়েকটি বাজারে অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া ছোট বিক্ষোভই ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি ও রিয়ালের দরপতনে ক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নামে। গত বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়, যখন নির্বাসিত শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভি প্রতিবাদ জোরদারের আহ্বান জানান। এর পরই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হুঁশিয়ারির প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা বাহিনী ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দমন-পীড়ন আরও কঠোর করে তোলে।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ মৃত্যু, হাসপাতালে ১,৭৫৩ সদ্য. একনেকে আড়াই লাখ কোটি টাকার তিন মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন সদ্য. পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে জিয়াউর রহমানের লেখা সদ্য. আওয়ামী লীগের মিছিল: ওসির পর এবার গুলশান জোনের ডিসি প্রত্যাহার সদ্য. আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভারত-পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজের মাঝে সংঘর্ষ সদ্য. হুথিদের ঠেকাতে যুক্তরাজ্যের সামরিক সহায়তা চাইল সৌদি সদ্য. নতুন দুজনই প্রকৃত আসামি, র‍্যাবের গ্রেপ্তার ৩ জনের সংশ্লিষ্টতা নেই: ডিবি সদ্য. সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের ফেরাতে ভারতের সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সদ্য. বিমানমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ, এভিয়েশন হাব নিয়ে আলোচনা সদ্য. সার্জেন্ট সৌরভের বদলিতে আক্ষেপ, মেনে নিতে পারছেন না শ্রীপুরবাসী সদ্য. ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ মৃত্যু, হাসপাতালে ১,৭৫৩ সদ্য. একনেকে আড়াই লাখ কোটি টাকার তিন মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন সদ্য. পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে জিয়াউর রহমানের লেখা সদ্য. আওয়ামী লীগের মিছিল: ওসির পর এবার গুলশান জোনের ডিসি প্রত্যাহার সদ্য. আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভারত-পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজের মাঝে সংঘর্ষ সদ্য. হুথিদের ঠেকাতে যুক্তরাজ্যের সামরিক সহায়তা চাইল সৌদি সদ্য. নতুন দুজনই প্রকৃত আসামি, র‍্যাবের গ্রেপ্তার ৩ জনের সংশ্লিষ্টতা নেই: ডিবি সদ্য. সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের ফেরাতে ভারতের সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সদ্য. বিমানমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ, এভিয়েশন হাব নিয়ে আলোচনা সদ্য. সার্জেন্ট সৌরভের বদলিতে আক্ষেপ, মেনে নিতে পারছেন না শ্রীপুরবাসী