ইরানে চলমান নতুন দফার বিক্ষোভ দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার দ্রুত অবমূল্যায়নে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এসব পরিস্থিতির মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমেছে। সরকারি দমন–পীড়নের মুখে অনেক এলাকায় আন্দোলন সহিংস রূপও নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে সিএনএন জানায়, গত মাসে তেহরানের বাজার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নেতৃত্ব ও সমন্বয়হীন এই আন্দোলনে অর্থনৈতিক দাবির সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষোভ যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরক হয়ে উঠছে।
বিক্ষোভের বাস্তবতা তুলে ধরে তেহরানের এক বাসিন্দা বলেন, এবারের আন্দোলন ভিন্ন, কারণ এটি সরাসরি মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। মানুষ প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারছে না, দাম দ্রুত বাড়ছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
জানা গেছে, তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা সরকারের ব্যর্থ অর্থনৈতিক নীতির প্রতিবাদ জানালে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়, যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানিকারকদের জন্য স্বল্পমূল্যে ডলার পাওয়ার একটি কর্মসূচি বাতিল করে। এর ফলে রান্নার তেল ও মুরগির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যায় এবং কিছু পণ্য বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়। ঐতিহাসিকভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমর্থক হিসেবে পরিচিত বাজারিরা দোকান বন্ধ করে আন্দোলনে নামায় সরকার প্রবল চাপে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রতি মাসে প্রায় সাত ডলার সমপরিমাণ নগদ সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বীকার করেন, সরকার একা এই সংকট সমাধান করতে পারবে না। এর মধ্যেই বিক্ষোভ বিভিন্ন প্রদেশের শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ইলম ও লোরেস্তানের মতো পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যেখানে খামেনির পতন ও মৃত্যুর দাবিতে স্লোগানও শোনা যাচ্ছে। এসব স্লোগান দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কর্তৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, ১১ দিনের বিক্ষোভে অন্তত ৩৮ জন নিহত এবং দুই হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে সরকার এখনো নিহত ও গ্রেপ্তারের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করেনি। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পশ্চিমাঞ্চলের সংঘর্ষে শতাধিক পুলিশ ও বাসিজ সদস্য আহত হয়েছেন।
ইরানে এবারের বিক্ষোভকে ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হওয়া আন্দোলনের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের আন্দোলনের বিশেষ দিক হলো বাজারিদের সক্রিয় ভূমিকা, যারা ঐতিহাসিকভাবে দেশটির রাজনৈতিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছেন। মুদ্রার অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক ধস তাদের এই অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকল্প রাজনৈতিক কাঠামোর অভাবে তাৎক্ষণিকভাবে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। তবে এই ব্যাপক অস্থিরতা ইরান সরকারের গভীর সংকট, জনগণের আস্থাহীনতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তাকে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।