‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ বিরল নয়, দেশের নানা খামারে পালন হচ্ছে অ্যালবিনো মহিষ

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:৩২
কোরবানির ঈদে রাজধানীর পশুর হাট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জাতীয় চিড়িয়াখানাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি মহিষ। ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের অ্যালবিনো জাতের এই মহিষটি নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে লালন–পালন করা হয়। মাথার সামনের সাদা চুলের বিশেষ বিন্যাস যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চুলের আদলের সঙ্গে মিল থাকায় খামারিরা মজা করেই এর নাম রাখেন ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। পরে সেই নামই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

ঈদের আগে পুরো মে মাসজুড়ে ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ভিড় করেন নারায়ণগঞ্জের ওই খামারে। কেউ ছবি তুলতে, কেউ ভিডিও ধারণ করতে, আবার কেউ কৌতূহল মেটাতে ছুটে যান মহিষটিকে দেখতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর ভিডিও ভাইরাল হয়ে পড়ে। বিভিন্ন টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এটি ‘সেলিব্রিটি মহিষ’ হিসেবে পরিচিতি পায়।

তবে মহিষটিকে ‘অত্যন্ত বিরল’ হিসেবে উপস্থাপন করাকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রাণিসম্পদ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অ্যালবিনো বা গোলাপি রঙের মহিষ বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খামারে বহুদিন ধরেই এ ধরনের মহিষ পালন হচ্ছে। কোথাও কোথাও শুধু অ্যালবিনো মহিষ নিয়েই বাণিজ্যিক খামার গড়ে উঠেছে। তাঁদের মতে, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ আলোচনায় এসেছে মূলত এর ব্যতিক্রমধর্মী চেহারা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার কারণে।

রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মের মালিক জিয়াউদ্দিন মৃধা জানান, মহিষটির চুলের ধরন দেখে তাঁর ভাই প্রথম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামটি দেন। শুরুতে বিষয়টি ছিল নিছক হাস্যরস। পরে সেটিই ভাইরাল হয়ে যায়। ঈদের আগে তিনি মহিষটি কেরানীগঞ্জের জিনজিরার ব্যবসায়ী মনিরুজ্জামানের কাছে বিক্রি করেন। সোমবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের খামার থেকে মহিষটিকে কেরানীগঞ্জে নেওয়া হয়। বিদায়ের সময় লালগালিচা, রঙিন ধোঁয়া ও ব্যান্ড বাজিয়ে আয়োজন করা হয়। সেই ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে শেষ পর্যন্ত মহিষটি কোরবানি করা হয়নি। পরে সেটিকে ঢাকার মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায় নেওয়া হয়।

ঈদুল আজহার দিন রাজধানীর অন্যান্য বিনোদনকেন্দ্রের তুলনায় জাতীয় চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল এই মহিষটি। চিড়িয়াখানার পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদের দিনে সাধারণত দর্শনার্থী কম থাকে। কিন্তু এবার মানুষ মহিষটি দেখতে বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছে। তিনি জানান, এটি একটি অ্যালবিনো মহিষ। বিশেষভাবে প্রদর্শনের পরিকল্পনা না থাকলেও বড় শেডে রাখার কারণে সহজেই দর্শনার্থীরা দেখতে পাচ্ছেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এক বিবৃতিতে বলেন, অ্যালবিনো মহিষটি দেশের প্রাণিসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। তাঁর দাবি, প্রতি ১০ হাজার মহিষে মাত্র একটি এমন বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম নিতে পারে। এ কারণেই মহিষটিকে সংরক্ষণের জন্য জাতীয় চিড়িয়াখানায় নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, মহিষটির জন্য বিশেষ শেড প্রস্তুত করা হয়েছে এবং সার্বক্ষণিক চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকেও জানানো হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, গবেষক ও খামারিরা বলছেন, অ্যালবিনো মহিষকে একেবারে বিরল হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন খামারে গোলাপি বা অ্যালবিনো মহিষ পালন করা হচ্ছে। বিশেষ করে সাভার, উত্তরাঞ্চল ও উপকূলীয় অঞ্চলের কিছু খামারে এ ধরনের মহিষ রয়েছে।

ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার শ্রীপুর গণকবাড়ী এলাকায় কাইয়ুম অ্যাগ্রো নামের একটি খামারে বর্তমানে প্রায় অর্ধশত অ্যালবিনো বা গোলাপি রঙের মহিষ রয়েছে। পাশাপাশি সেখানে মুররাহ, নিলিরাভি ও জাফরাবাদী জাতের মহিষও পালন করা হচ্ছে।

খামারটির মালিক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, প্রায় নয় বছর আগে শখের বসে খামার শুরু করেছিলেন। শুরুতে গরু ও ছাগল থাকলেও পরে মহিষ পালন শুরু করেন। গত কয়েক বছর ধরে গোলাপি মহিষ বিক্রি করছেন। এখন কোরবানির বাজারে এসব মহিষের চাহিদা বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য, মানুষ প্রথমে কৌতূহল নিয়ে দেখতে আসে, পরে অনেকেই কিনে নেয়। তিনি জানান, গোলাপি মহিষের মাংস তুলনামূলক নরম ও সুস্বাদু। বর্তমানে প্রতি কেজি মাংসের হিসাবে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা দরে মহিষ বিক্রি হচ্ছে। একেকটি অ্যালবিনো মহিষের ওজন ৪০০ থেকে ৯০০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।

তিনি আরও বলেন, এসব মহিষ দেখতে আলাদা হওয়ার পাশাপাশি রোগও কম হয়। গরুর তুলনায় মহিষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেশি এবং খাবারের খরচও কম। এ কারণে এখন অনেক খামারি মহিষ পালনের দিকে ঝুঁকছেন।

সাভারের প্রয়াস অ্যাগ্রো খামারের মালিক মোহাম্মদ যুবায়ের বলেন, মহিষ পালন তুলনামূলক সহজ। গরুর ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট খাবার দিয়েও মহিষ পালন করা সম্ভব। ফলে খরচ কম পড়ে। তিনি বলেন, দেশে এখন মহিষের মাংসের চাহিদাও বাড়ছে। আগে মানুষ শুধু গরুর মাংস খেত, এখন অনেকেই মহিষের মাংস পছন্দ করছেন।

খামারিদের মতে, মহিষের মাংসে তুলনামূলক কম চর্বি ও বেশি প্রোটিন থাকায় স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যেও এর চাহিদা বাড়ছে। অনেক চিকিৎসকও লাল মাংসের বিকল্প হিসেবে মহিষের মাংসকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করেন।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার কোরবানির জন্য দেশে প্রস্তুত ছিল ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯টি মহিষ। যদিও গরু ও ছাগলের তুলনায় এই সংখ্যা কম, তবু গত কয়েক বছরে মহিষের বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে বড় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালবিনো কোনো আলাদা প্রজাতি নয়; এটি একটি জিনগত বৈশিষ্ট্য। প্রাণীর শরীরে মেলানিন নামের রঞ্জক পদার্থ কম থাকলে ত্বক, চোখ ও লোমে সাদা বা গোলাপি আভা দেখা যায়। এ কারণেই এসব মহিষের গায়ের রঙ গোলাপি বা হালকা সাদা হয়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আলম মিয়া বলেন, অ্যালবিনো বৈশিষ্ট্য বিরল হতে পারে, তবে এটি একেবারে নতুন বা অদেখা নয়। বাংলাদেশে আগে থেকেই এমন মহিষ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এবার বিষয়টি বেশি আলোচনায় এসেছে। তিনি বলেন, মহিষটিকে গবেষণার আওতায় আনা যেতে পারে। তবে এমনভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয়, যাতে মনে হয় দেশে আগে কখনও এমন প্রাণী ছিল না।

একসময় কোরবানির পশু হিসেবে মহিষের চাহিদা সীমিত ছিল। শহরের অনেক মানুষ মহিষের মাংস খেতেও অভ্যস্ত ছিলেন না। কিন্তু গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি বদলেছে। বড় আকার, তুলনামূলক কম দাম ও স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় এখন অনেকেই মহিষ কিনছেন। আগে মহিষের ক্রেতা মূলত গ্রামাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ঢাকাসহ বড় শহরেও এর বাজার তৈরি হয়েছে। খামারিরা মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ সেই আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রাণিসম্পদ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মহিষকে ঘিরে নতুন এই আগ্রহ ভবিষ্যতে দেশে মহিষ পালন শিল্পকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে সঠিক তথ্যভিত্তিক উপস্থাপন জরুরি, যাতে অযথা বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়। সূত্র: সমকাল

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার ও মর্যাদার গল্পের সূচনা হোক এখনই: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সদ্য. ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: রোববার থেকে শুরু পোস্টাল ভোটের নিবন্ধন সদ্য. প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক সদ্য. রাজধানী থেকে গ্রেপ্তার আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি সদ্য. একসঙ্গে পুলিশের ৭ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বদলি সদ্য. জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন ঘিরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী সদ্য. চাপের কাছে মাথা নত করবে না ইরান: জাতিসংঘে পেজেশকিয়ান সদ্য. চবি ভিসির প্রথম নিয়োগে ১২ জনের ৮ জনই নিজ গ্রামের, বাকি ৪ জন উপজেলার সদ্য. বারিধারায় গাড়িচাপা: মামলায় নাম নেই গতকাল আটক সেই কিশোরের সদ্য. সরকারি সব কলেজের উদ্দেশে মাউশির জরুরি নির্দেশনা সদ্য. রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার ও মর্যাদার গল্পের সূচনা হোক এখনই: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সদ্য. ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: রোববার থেকে শুরু পোস্টাল ভোটের নিবন্ধন সদ্য. প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক সদ্য. রাজধানী থেকে গ্রেপ্তার আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি সদ্য. একসঙ্গে পুলিশের ৭ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বদলি সদ্য. জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন ঘিরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী সদ্য. চাপের কাছে মাথা নত করবে না ইরান: জাতিসংঘে পেজেশকিয়ান সদ্য. চবি ভিসির প্রথম নিয়োগে ১২ জনের ৮ জনই নিজ গ্রামের, বাকি ৪ জন উপজেলার সদ্য. বারিধারায় গাড়িচাপা: মামলায় নাম নেই গতকাল আটক সেই কিশোরের সদ্য. সরকারি সব কলেজের উদ্দেশে মাউশির জরুরি নির্দেশনা