শহীদ ওসমান হাদির রাজনৈতিক অবস্থান, ঢাকা-৮ আসনে তাঁর প্রার্থিতা এবং মৃত্যুর পর তাঁকে ঘিরে বিভিন্ন দলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক একান্ত সহকারী রাশেদ খান। তাঁর অভিযোগ, জীবদ্দশায় হাদির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বিরোধ ছিল, অথচ তাঁর মৃত্যুর পর দল দুটি তাঁকে নিজেদের আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে এসব কথা বলেন রাশেদ খান। পোস্টে তিনি ঢাকা-৮ আসনে হাদির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা, সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে বিরোধ এবং তাঁর মৃত্যুর পর রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দল ও ব্যক্তিদের বক্তব্য পোস্টটিতে উল্লেখ করা হয়নি।
ঢাকা-৮ আসনে প্রার্থিতা নিয়ে প্রশ্ন
রাশেদ খানের দাবি, ঢাকা-৮ আসনে ওসমান হাদির বিপরীতে এনসিপি সুজন নামে এক রিকশাচালককে প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। অন্যদিকে, জামায়াতের আমিরের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচিত জুবায়ের তাঁকে ওই আসনে নির্বাচন না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। ওই আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে সাদিক কায়েমের নামও উল্লেখ করেন রাশেদ খান।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হাদি তখন জানিয়েছিলেন, প্রয়োজনে মাত্র ৫০০ ভোট পেলেও তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকেই নির্বাচন করবেন। এ প্রসঙ্গে হাদির ভাই ওমর হাদির একটি ফেসবুক পোস্টের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
রাশেদ খান আরও দাবি করেন, হাদি প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, ঢাকা-৮ আসনে অন্য কোনো দল যেন তাঁর বিপরীতে প্রার্থী না দেয়। কিন্তু এনসিপির পক্ষ থেকে পাল্টা প্রার্থী দেওয়ার ঘটনাকে তিনি হাদির প্রতি অসম্মান হিসেবে দেখছেন। পরে সুজনকে চূড়ান্ত প্রার্থী না করার বিষয়টিও তাঁর সমালোচনার কারণ হয়ে উঠেছে।
জামায়াতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে রাশেদ খান জানতে চান, হাদির মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি সমর্থন ও শ্রদ্ধা প্রকাশকারীরা জীবদ্দশায় তাঁর আহ্বানে কেন সাড়া দেননি।
মৃত্যুর পর হাদিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক
পোস্টে রাশেদ খান অভিযোগ করেন, হাদি জীবিত থাকতে এনসিপির দুর্নীতির অভিযোগ, জুলাইয়ের ঐক্য বিনষ্ট এবং আন্দোলনকে কুক্ষিগত করার মতো বিষয় নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। একই সঙ্গে জামায়াতকে ‘গুপ্ত’ বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রাশেদ খানের মতে, হাদির মৃত্যুর পর তাঁকে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের আদর্শের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে জামায়াত ও এনসিপি। তবে এসব বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মূল্যায়ন; সংশ্লিষ্ট দলগুলোর প্রতিক্রিয়া ছাড়া অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দিন পাটোয়ারীর একটি বক্তব্য নিয়েও আপত্তি জানান রাশেদ খান। তাঁর অভিযোগ, হাদির রাজনৈতিক সংগ্রামকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তুলনা করার মধ্য দিয়ে তাঁকে বিএনপির নেতাকর্মীদের মুখোমুখি দাঁড় করানোর পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে।
এ অবস্থায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে রাশেদ খান বলেন, হাদির রাজনৈতিক আদর্শে জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংগ্রামের প্রভাব ছিল। তাই হাদিকে বিএনপির প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা সফল হবে না বলে তিনি মনে করেন।
নজরুলের মাজারের পাশে কবর দেওয়া নিয়েও বক্তব্য
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে ওসমান হাদিকে দাফন করা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের বিষয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন রাশেদ খান।
তিনি বলেন, একজন হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তির কবর কোথায় হবে, তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা উচিত নয়। তাঁর দাবি, হাদি জীবদ্দশায় যমুনা ঘেরাও কর্মসূচি থেকে মৃত্যুর পর বাবার কবরের পাশে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে হাদির তুলনা না করার আহ্বান জানালেও রাশেদ খান তাঁকে নজরুলের বিপ্লবী চেতনার অনুসারী হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, গুরু-শিষ্যের সমাধি পাশাপাশি থাকায় আপত্তির কোনো কারণ নেই।
নুরুল হক নুরের বক্তব্য নিয়েও মন্তব্য
পোস্টের শেষাংশে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের সঙ্গে ওসমান হাদির সম্পর্কের প্রসঙ্গ তোলেন রাশেদ খান। তাঁর দাবি, দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং বিভিন্ন সময়ে তাঁরা একে অপরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
রাশেদ খানের ভাষ্য, নুরুল হকের বক্তব্যের একটি অংশ কেটে প্রচার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। তিনি নুরুল হককে বিষয়টি পরিষ্কার করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে হাদির বড় ভাইয়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, হাদির ভাইও এমন বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকার পক্ষে, যা মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের সুযোগ তৈরি করে।
সবশেষে রাশেদ খান বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থে ওসমান হাদিকে টানাহেঁচড়া না করে তাঁকে সর্বজনীনভাবে স্মরণ করা উচিত। তাঁর মতে, হাদির নামকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
সদ্য সংবাদ/এসকে