ঢাকার বাস থেকে দিনে ৫২ লাখ টাকা চাঁদা আদায়

স
সদ্য সংবাদ ডেস্ক
১০ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:২৩:৪৬
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর সড়কে বাস চলাচল করতে গিয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে দিতে হচ্ছে নির্ধারিত অঙ্কের টাকা। কোথাও কয়েকশ, কোথাও আবার হাজার টাকার বেশি। একাধিক স্থানে যাতায়াতের পথে বারবার এই অর্থ দিতে হচ্ছে পরিবহনগুলোকে। বাসের পাশাপাশি অন্যান্য গণপরিবহন ও পণ্যবাহী যান থেকে আদায় করা অর্থের পরিমাণও বড়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ঢাকায় চলাচলকারী বাস থেকেই প্রতিদিন প্রায় ৫২ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। আর অন্যান্য যানবাহন যুক্ত করলে এ অঙ্ক ছাড়িয়ে যায় দুই কোটি টাকা।

পরিবহন খাতের এই অর্থ আদায়ের চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন বাসের হিসাব, সংশ্লিষ্ট সংগঠনের বক্তব্য এবং পরিবহন টার্মিনাল ও স্ট্যান্ডের তথ্য থেকে। তবে সব অর্থই অবৈধ চাঁদা কি না, তা নির্ধারণে বৈধ ফি, পরিচালন ব্যয় এবং জোরপূর্বক আদায়ের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।

এক বাস থেকেই দিনে ৩ হাজার টাকার বেশি আদায়

সাইনবোর্ড থেকে ঢাকার ভেতর দিয়ে বাইপাইল পর্যন্ত চলাচল করে লাব্বাইক পরিবহন। এই পথে বাসগুলোকে একাধিক স্থানে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাইনবোর্ড, শনির আখড়া, বৌদ্ধমন্দির, খামারবাড়ি, রেডিও কলোনি ও বাইপাইলসহ বিভিন্ন পয়েন্টে যাতায়াতের সময় অর্থ দিতে হয়। ফিরতি পথেও একইভাবে কয়েকটি স্থানে টাকা আদায় করা হয়।

প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, একটি বাসের দুই ট্রিপে মোট ২৪টি পয়েন্টে অর্থ দিতে হয়। সব মিলিয়ে একটি বাস থেকে দিনে ৩ হাজার ১৬০ টাকা আদায় করা হয়। এর মধ্যে কোম্পানির পরিচালনা বোর্ড এবং অর্থ সংগ্রহে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন খরচ বাবদ ৬৯২ টাকা ব্যয় হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

লাব্বাইক পরিবহনের বাস চলে প্রায় ৭০টি। সেই হিসাবে কোম্পানির খরচের নামে প্রতিদিন আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ২১ হাজার ২০০ টাকা। আর টোলসহ কোম্পানির দৈনিক খরচ দেখানো হয়েছে ৪৮ হাজার ৪৪০ টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে লাব্বাইক পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ হাসান মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কথা বলব না। আপনার খোঁজ আপনি নেন।’

বাস থেকেই দিনে ৫২ লাখ টাকা

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় চলাচলের উপযোগী বাস রয়েছে প্রায় ছয় হাজার। এর মধ্যে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে সাড়ে চার হাজার বাস সড়কে নামে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব বাস থেকে গড়ে প্রতিদিন ১ হাজার ২৫০ টাকা করে আদায় করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার ২০০ বাস চলাচল করে ধরে হিসাব করলে মোট আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলমও প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ টাকা আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তাঁর দাবি, পরিবহন কোম্পানিগুলো পরিচালন ব্যয়ের নামে এসব অর্থ সংগ্রহ করে।

তিনি বলেন, কোম্পানি চালাতে যতটুকু খরচ প্রয়োজন, ততটুকুই নেওয়া উচিত। লাব্বাইক পরিবহনের আদায়ের পরিমাণকে তিনি অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সমিতি নিজে কোনো চাঁদা তোলে না এবং এ অর্থের ভাগও নেয় না।

সাইফুল আলম আরও অভিযোগ করেন, চাঁদার একটি বড় অংশ পুলিশকে দেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য, কাগজপত্র ঠিক না থাকলে পুলিশ বেশি অঙ্কের মামলা দিতে পারে। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান এ বক্তব্যের ভিত্তি নেই বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেন, পরিবহন মালিকদের সব জায়গায় টাকা দেওয়া বন্ধ করতে বলা হোক। কাগজপত্র ঠিক থাকলে পুলিশ কীভাবে মামলা দেয়, তা তিনি দেখবেন।

সব ধরনের যানবাহন ধরলে আদায় দুই কোটি টাকার বেশি

বাসের বাইরেও রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় চলাচলকারী বিভিন্ন ধরনের যানবাহন থেকে অর্থ আদায় করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে লেগুনা, অটোরিকশা, পিকআপ, ট্রাক, মাইক্রোবাস এবং স্থানীয় ও আন্তজেলা বাস।

প্রতিবেদনে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ঢাকার ৫৩টি পরিবহন টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ টাকা আদায় করা হয়। এর মধ্যে ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা পরিবহন মালিক সমিতির নামে সংগ্রহ করা হয়। বাকি অর্থ সিটি করপোরেশন, টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ, কাউন্টার পরিচালনা, শ্রমিক, লাইনম্যান, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীদের খরচসহ বিভিন্ন খাতে নেওয়া হয়।

তবে এই মোট অর্থের কতটা বৈধ ফি এবং কতটা অবৈধ চাঁদা, তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

টিআইবির গবেষণায়ও অনিয়মের চিত্র

পরিবহন খাতে অনিয়ম ও অর্থ আদায় নিয়ে ২০২৪ সালের ৫ মার্চ একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের বেসরকারি বাস ও মিনিবাস খাতে প্রতি বছর অন্তত ১ হাজার ৫৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা চাঁদা ও অনিয়মের মাধ্যমে আদায় করা হয়।

টিআইবির হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ৯০০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিআরটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ হিসেবে দেওয়া হয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, সিটি করপোরেশন এবং মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে অর্থ আদায়ের তথ্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

নির্দেশিকায় নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি আদায়ের অভিযোগ

সড়ক ও মহাসড়কে পরিবহন থেকে অর্থ আদায়ের নিয়ম নির্ধারণে ২০২০ সালে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো যৌথভাবে ‘সড়ক পরিবহনে সংগঠন পরিচালন ব্যয়/সার্ভিস চার্জ সম্পর্কিত নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করে। এতে কোন সংগঠন কোথায় এবং সর্বোচ্চ কত টাকা নিতে পারবে, তার সীমা নির্ধারণ করা হয়।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাস থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি বা ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি সর্বোচ্চ ২০ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট টার্মিনাল মালিক সমিতি সর্বোচ্চ ৩০ টাকা পরিচালন ব্যয় নিতে পারে। অর্থাৎ এ দুই খাতে একটি বাস থেকে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা আদায়ের সুযোগ রয়েছে।

গাবতলী থেকে পরিচালিত বাসের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর জন্য আলাদা হার নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাস টার্মিনাল ও নির্দিষ্ট কিছু স্থানে শ্রমিক সংগঠন এবং কমিউনিটি পুলিশিংয়ের জন্যও নির্ধারিত অঙ্কের অর্থ নেওয়ার বিধান রয়েছে।

নির্দেশিকায় সড়ক-মহাসড়কে বাস দাঁড় করিয়ে চাঁদা আদায়, ২৪ ঘণ্টায় একাধিকবার অর্থ সংগ্রহ এবং নির্ধারিত স্থানের বাইরে টাকা নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্ধারিত হারের বেশি অর্থ আদায় বা জোরপূর্বক টাকা নেওয়া হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

তবে পরিবহন শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ হানিফ খোকন এ নির্দেশিকার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, শ্রম আইন ও সড়ক পরিবহন আইনে টার্মিনালের বাইরে চাঁদা তোলার সুযোগ নেই। বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা নির্দেশিকা তৈরি করে চাঁদা আদায়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

হানিফ খোকনের ভাষ্য, নির্দেশিকায় একবার অর্থ নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দিনে বহুবার টাকা আদায় করা হচ্ছে। তাঁর মতে, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হলে সরকারকে কঠোর হতে হবে এবং দলীয় পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারকারীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

পরিবহন খাতে পরিচালন ব্যয়ের নামে অর্থ আদায়, নির্ধারিত ফি অমান্য এবং অবৈধ চাঁদাবাজির অভিযোগ- সব মিলিয়ে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে।

তথ্যসূত্র: আগামীর সময়

সদ্য সংবাদ/এসকে

রাজধানী ব্রেকিং

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. অনির্দিষ্টকালের জন্য রিয়াদে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সদ্য. রোববার থেকে সাজেকে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ ঘোষণা সদ্য. বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর সদ্য. দেশে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত রয়েছে: খাদ্যমন্ত্রী সদ্য. শিশু আভানের মৃত্যুতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল ইউনিভার্সেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সদ্য. ঢাকার বাস থেকে দিনে ৫২ লাখ টাকা চাঁদা আদায় সদ্য. দিল্লিতে পুলিশের হাতে আটক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় আটক ৩ সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা বেড়েছে, মন্তব্য রিজভীর সদ্য. সংখ্যালঘু শব্দে বিশ্বাস করে না বর্তমান সরকার: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সদ্য. অনির্দিষ্টকালের জন্য রিয়াদে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সদ্য. রোববার থেকে সাজেকে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ ঘোষণা সদ্য. বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর সদ্য. দেশে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত রয়েছে: খাদ্যমন্ত্রী সদ্য. শিশু আভানের মৃত্যুতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল ইউনিভার্সেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সদ্য. ঢাকার বাস থেকে দিনে ৫২ লাখ টাকা চাঁদা আদায় সদ্য. দিল্লিতে পুলিশের হাতে আটক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় আটক ৩ সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা বেড়েছে, মন্তব্য রিজভীর সদ্য. সংখ্যালঘু শব্দে বিশ্বাস করে না বর্তমান সরকার: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী