আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলে একাধিক ফৌজদারি মামলায় দেওয়া সাজা একই সময়ে কার্যকর হবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। পৃথক মামলায় সাজা দেওয়ার সময় আদালত যদি সাজাগুলো একসঙ্গে চলার বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশ না দেন, তাহলে একটি মামলার সাজা শেষ হওয়ার পর পরবর্তী মামলার সাজা কার্যকর হবে।
চেক ডিজঅনারের ছয়টি পৃথক মামলায় দণ্ডিত এক ব্যক্তিকে কারাগারে রাখার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের রুল খারিজ করে এই রায় দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট রায়টি দেন। সম্প্রতি এর পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে।
‘মো. নাসির উদ্দিন বনাম রাষ্ট্র’ মামলার রায়ে আদালত জানান, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৯৭ ধারার বিধান অনুযায়ী পৃথক মামলায় সাজা দেওয়া হলে বিচারিক আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ ছাড়া সেগুলো একসঙ্গে চলবে না। ফলে সাজাগুলো ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হবে।
মামলার নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মো. নাসির উদ্দিন নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১- এর ১৩৮ ধারায় দায়ের করা চেক ডিজঅনারের ছয়টি পৃথক মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত হন। ২০২১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
একপর্যায়ে সাজা ভোগের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তাকে কারাগারে রাখা হয়েছে- এমন অভিযোগ তুলে ২০২২ সালে হাইকোর্টে রিট করেন নাসির উদ্দিন। তার দাবি ছিল, বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে থাকার সময় ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার আওতায় সাজা থেকে বাদ দেওয়ার পর তার কারাভোগের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
রিটের শুনানিতে তার আইনজীবী মো. শাহ আলম বলেন, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো বিচারাধীন থাকা অবস্থায় নাসির উদ্দিন কারাগারে ছিলেন। ওই সময় সাজা থেকে সমন্বয় করা হলে তার সাজা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। তাই তাকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে বিবাদীদের পক্ষে আইনজীবী মো. সমীর সাত্তার যুক্তি দেন, কোনো ব্যক্তি এক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর অন্য মামলায়ও দণ্ডিত হলে আদালত স্পষ্টভাবে সাজা একই সঙ্গে চলার নির্দেশ না দিলে সাজাগুলো ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হবে। নাসির উদ্দিনের মামলাগুলোতে এমন কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি বলেও আদালতকে জানান তিনি।
আইনজীবীর বক্তব্য ছিল, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার অধীনে বিচার চলাকালে আসামি যে নির্দিষ্ট মামলায় হেফাজতে ছিলেন, কেবল সেই মামলার সাজা থেকে ওই সময় বাদ দেওয়া যাবে। এক মামলায় কারাভোগের সময় অন্য মামলার সাজা কমানোর ক্ষেত্রে ব্যবহার করার সুযোগ নেই।
পক্ষগুলোর বক্তব্য ও মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, বিচার চলাকালে কোনো আসামি নির্দিষ্ট যে মামলায় কারাভোগ করেছেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারা অনুযায়ী কেবল সেই মামলার মোট সাজা থেকেই ওই সময় বাদ যাবে। আর ৩৯৭ ধারার অধীনে পৃথক মামলায় সাজা একই সঙ্গে চলার বিষয়ে বিচারিক আদালতের নির্দেশ না থাকলে সাজাগুলো একের পর এক কার্যকর হবে।
এ ছাড়া, রিটের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আইনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন না তুলে ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিল করার সুযোগ নেই বলেও মত দেন হাইকোর্ট। একইভাবে বিচারিক আদালতের দেওয়া ফৌজদারি রায়ে রিট এখতিয়ার প্রয়োগ করে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
রায়ে নাসির উদ্দিনকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ছয়টি মামলায় বিচারাধীন অবস্থায় তার কারাভোগের সময় হিসাব করে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের বিষয়টি নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সদ্য সংবাদ/এসকে