জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেন- চার ধরনের জ্বালানির ক্ষেত্রেই নতুন দাম কার্যকর হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। সেই চাপ সামাল দিতেই দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে জ্বালানি আমদানির ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত বছরের এপ্রিলে আমদানি বাবদ ব্যয় ছিল ৪ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের একই সময়ে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকায়।
মে মাসেও দেখা গেছে বড় পরিবর্তন। ৪ হাজার ১৮২ কোটি টাকা থেকে আমদানি ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকায়। আগস্টে ২ হাজার ৭৪০ কোটি ৬২ লাখ টাকা থেকে বেড়ে এই ব্যয় পৌঁছায় ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকায়।
আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি বাড়তে থাকে বিপিসির লোকসানও। মার্চ থেকে আগস্ট- এই ছয় মাসে সংস্থাটির নিজস্ব তহবিলে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
এর মধ্যে শুধু এপ্রিলেই লোকসান হয়েছে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। জুনে লোকসানের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সেপ্টেম্বরেও লোকসানের পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অর্থসংকট মেটাতে এখন ব্যাংকের ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে বিপিসিকে। সংস্থাটির হিসাবে, চলতি বছর এ পর্যন্ত ব্যাংক থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক হিসাবে রয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা।
তবে আগামী দুই মাসের জ্বালানি আমদানির খরচ মেটাতেই প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
এ অবস্থায় গত ৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবকে চিঠি দেয় বিপিসি। সেখানে গত ছয় মাসের লোকসান সামাল দিতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি তেলের ওপর শুল্ক ও কর কমানো বা প্রত্যাহারের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল।
পরে বিপিসির আর্থিক সংকট নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিপিসিকে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এদিকে রোববার জারি করা প্রজ্ঞাপনে বিপিসির লোকসানের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। এতে প্রতিদিন সংস্থাটির লোকসান দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১০৯ কোটি টাকা।
শুধু ডিজেল বিক্রি থেকেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা করা হয়েছিল।
তবে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকরের পেছনে মূল লক্ষ্য হিসেবে বিপিসির বাড়তে থাকা লোকসান ও আমদানি ব্যয়ের চাপ কমানোর বিষয়টিই সামনে এসেছে।
সদ্য সংবাদ/এসকে