ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিতরণে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অপচয় এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী বাছাইয়ের জটিলতা দূর করতে পুরো কার্যক্রমকে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। প্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থায় সুবিধাভোগী শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে পণ্য বিক্রি, ডিলার নিয়োগ, অর্থ পরিশোধ ও সার্বিক তদারকি সবকিছুতেই তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় চালু হবে ডিজিটাল টিসিবি কার্ড ও ‘উপকারী’ মোবাইল অ্যাপ। পাশাপাশি থাকবে অনলাইন ডিলার ম্যানেজমেন্ট, অল-ইন-ওয়ান পিওএস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর রিয়েল-টাইম মনিটরিং। এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভর্তুকির পণ্য বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) টিসিবির সম্মেলন কক্ষে সংস্থাটির ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহারের মূল লক্ষ্য হবে মানুষের সেবা নিশ্চিত করা এবং সেই সেবা সহজ, স্বচ্ছ ও মর্যাদাপূর্ণ করা। নতুন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কোনো উপকারভোগীর কার্ড হারিয়ে গেলেও তিনি পণ্য পাওয়ার সুবিধা থেকে বাদ পড়বেন না।
‘উপকারী’ অ্যাপের সাহায্যে ডিজিটাল পরিচয় এবং এনক্রিপ্টেড কিউআর কোডের মাধ্যমে একজন সুবিধাভোগীর পরিচয় ও পণ্য গ্রহণের যোগ্যতা যাচাই করা হবে। এতে কাগজের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং একজনের কার্ড অন্য ব্যক্তি ব্যবহার করার সম্ভাবনাও হ্রাস পাবে।
ডিজিটাল ব্যবস্থায় যাওয়ার আগে সুবিধাভোগীদের বিদ্যমান তালিকায় বড় ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনার পর প্রায় ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারীকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে টিসিবির জন্য একটি যাচাইকৃত ডিজিটাল ডেটাবেস প্রস্তুত করা হয়েছে।
বর্তমানে টিসিবির সুবিধা পাচ্ছেন প্রায় ৭৯ লাখ মানুষ। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা এক কোটিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। যাচাইকৃত তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে সরকারি ভর্তুকি প্রকৃত ও যোগ্য মানুষের কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি একই ব্যক্তি একাধিকবার সুবিধা নেওয়া কিংবা অযোগ্য ব্যক্তির তালিকায় থাকার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।
পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও আসছে প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তন। টিসিবির নতুন ব্যবস্থায় অল-ইন-ওয়ান পিওএস ব্যবহার করে একসঙ্গে পণ্য বিক্রি, বায়োমেট্রিক পরিচয় যাচাই, অনলাইন পেমেন্ট এবং তাৎক্ষণিক বিক্রয় রশিদ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।
এআইভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পণ্য বিতরণের পরিমাণ, বিক্রির গতি এবং কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। সুবিধাভোগীদের তথ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য এআইনির্ভর কন্ট্রাক্ট সেন্টার চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
ডিলার নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনাতেও ডিজিটাল পদ্ধতি যুক্ত হচ্ছে। অনলাইন ডিলার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ, তথ্য সংরক্ষণ এবং নিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হলে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে ডিলার বাছাইয়ের সুযোগ রাখা হবে। পাশাপাশি অনলাইন পেমেন্ট কালেকশন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
টিসিবির ডিজিটাল রূপান্তর এবং ব্যবস্থাপনায় আনা বিভিন্ন সংস্কারের কারণে চলতি অর্থবছরে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি সাশ্রয় হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার, সঠিক সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভর্তুকির অপচয় আরও কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, দেশের সরবরাহব্যবস্থায় উৎপাদক পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পণ্যের দামের মধ্যে এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে। আবার কোনো কোনো এলাকায় সাময়িক সরবরাহ ঘাটতির কারণেও বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে ভর্তুকি দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিতে টিসিবির কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে ভর্তুকির পণ্য বিতরণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য প্রতিরোধেও ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে জনবল, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সরঞ্জামের পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
পর্যায়ক্রমে অধিদফতরের বিদ্যমান সেবাগুলোও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত করার কার্যক্রম আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে টিসিবির ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় সুবিধাভোগী নির্বাচন থেকে শুরু করে ডিলার নিয়োগ, পণ্য বিক্রি, আর্থিক লেনদেন এবং সার্বিক নজরদারি প্রতিটি ধাপই পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল ও তথ্যনির্ভর ব্যবস্থার মধ্যে চলে আসবে।
সদ্য সংবাদ/ এআর