বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের পর আবারও সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ ও আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই দেশের কর্মকর্তারা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফরের প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছেন বলে কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু। সূত্রগুলোর দাবি, আগামী নভেম্বরেই সফরটি আয়োজনের চেষ্টা চলছে।
দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এর প্রভাব পড়ে ঢাকা-নয়াদিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতের নয়াদিল্লিতে অজ্ঞাত একটি স্থানে অবস্থান করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ঢাকায় দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে সামনে রেখে সফরের আলোচ্যসূচি তৈরির কাজও চলছে। রাজনৈতিক সম্পর্কের অস্থিরতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আবার স্বাভাবিক করার বিষয়টি সেখানে গুরুত্ব পেতে পারে। একই সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের বিষয়টিও আলোচনায় ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢাকার একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্ক যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে তাঁর একাধিক কূটনৈতিক কর্মসূচি রয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যেই নভেম্বরের সুবিধাজনক সময়ে নয়াদিল্লি সফর আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিন।
সম্প্রতি ভারতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে ওই আয়োজনে বাংলাদেশ কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি। সে সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছিলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘রিসেট’ বা নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে ঢাকার। এ প্রক্রিয়ায় উপযুক্ত বা ‘অনুকূল’ সময়ে একটি দ্বিপক্ষীয় সফরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
এর আগে দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটি কর্মসূচি বাতিলের ঘটনাকে বিএনপি সরকার ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখেছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন এবং তখন থেকেই দেশটিতে অবস্থান করছেন। তাঁর সর্বশেষ ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল।
গত দুই বছরে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারের কয়েকজন শীর্ষ মন্ত্রী ও কর্মকর্তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়নে তাঁদের ভূমিকার অভিযোগে এসব রায় দেওয়া হয়। ওই দমন-পীড়নের ধারাবাহিক ঘটনাই শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিকে নিয়ে যায়।
দ্য হিন্দুর সূত্রের দাবি, তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় কর্মকর্তাদের যোগাযোগ নতুন করে শুরু হয়েছিল অন্তত ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে। সে সময় দিল্লির অবস্থান বোঝার জন্য তিনি একজন দূতকে ভারতে পাঠিয়েছিলেন। এর পেছনে ২০২৪ সালের জানুয়ারির ব্যাপকভাবে সমালোচিত জাতীয় নির্বাচনও একটি কারণ ছিল। ওই নির্বাচন বয়কট করেছিল বিএনপি।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের সময় ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিএনপি ও ভারতের মধ্যে যে যোগাযোগ ছিল, পরবর্তী সময়ের এই যোগাযোগকে তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের প্রায় দুই মাস আগে বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু নয়াদিল্লি সফর করেছিলেন। তখন দ্য হিন্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের জনগণের ‘গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি দ্ব্যর্থহীন সমর্থন’ জানানোর জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এরও আগে ২০১৮ সালে বিএনপির তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ভারত সফর করে। ওই প্রতিনিধি দলে ছিলেন আবদুল আউয়াল মিন্টু, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং হুমায়ুন কবির।
সদ্য সংবাদ/ এআর