মক্কা চুক্তির পরপরই সৌদিতে হুতিদের হামলা, কঠিন পরীক্ষায় পাকিস্তান-তুরস্ক

সদ্য সংবাদ ডেস্ক
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৫৮:৪৪
ছবি: সংগৃহীত

হুতিদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। চুক্তির মূল ধারণা অনুযায়ী, জোটের কোনো একটি সদস্যের ওপর হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা। তবে সৌদি আরবে ধারাবাহিক হামলার পরও পাকিস্তান ও তুরস্ক এখন পর্যন্ত সরাসরি সামরিক সহায়তায় এগিয়ে আসেনি।

গত কয়েক দিনে সৌদি ভূখণ্ড, জ্বালানি অবকাঠামো এবং ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে একের পর এক হামলা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চুক্তির দুই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার পাকিস্তান ও তুরস্কের ভূমিকা কেবল কূটনৈতিক সমর্থন ও সংহতির বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকায় প্রশ্ন উঠেছে—মক্কা চুক্তি কি কার্যকর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট, নাকি মূলত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার কাঠামো?

চুক্তি গঠনের সময় এটিকে ন্যাটোর আদলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এর কার্যক্রম ন্যাটোর মতো কোনো সম্মিলিত সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

২০২৫ সালের সৌদি-পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সমঝোতার ভিত্তিতে পরে তুরস্ককে যুক্ত করে মক্কা চুক্তির পরিধি বাড়ানো হয়। মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তার দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও উদ্যোগটিকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পর সৌদি আরব যখন ধারাবাহিক হামলার মুখে, তখন পাকিস্তান ও তুরস্কের কার্যক্রম এখনো মূলত কূটনৈতিক অবস্থানেই সীমাবদ্ধ।

গত সপ্তাহ থেকে হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি স্থাপনা ও কৌশলগত অবকাঠামো।

হামলার মধ্যে বড় ঘটনা ছিল সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বা পেট্রলাইনে আঘাত। হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে যাওয়ার পর ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে লোহিত সাগরে তেল রপ্তানির জন্য এই পাইপলাইনই গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

ইয়ানবু থেকে এশিয়ার বাজারে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রেও জাহাজগুলোকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি পাড়ি দিতে হয়। ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা ও মোখা বন্দর হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ওই রুটেও তাদের প্রভাব রয়েছে। ফলে সৌদি আরবের বিকল্প দুই জ্বালানি করিডরই চাপের মুখে পড়েছে।

হামলার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি জানান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা আঞ্চলিক শান্তি, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকি। শাহবাজ শরিফ বলেন, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং হারামাইন শরিফাইনের নিরাপত্তার প্রশ্নে পাকিস্তান অবিচল।

তবে সংহতি প্রকাশ করলেও পাকিস্তান কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেয়নি। এর পেছনে দেশটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে। হুতিদের প্রধান মিত্র ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের ৯০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তিক্ত অভিজ্ঞতাও রয়েছে ইসলামাবাদের।

এর পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে পূর্ব সীমান্তের উত্তেজনা, উত্তর-পশ্চিমে আফগান তালেবানের সঙ্গে সংঘাত এবং দেশের অভ্যন্তরে বেলুচ ও তেহরিক-ই-তালেবান বিদ্রোহ মোকাবিলা করতে গিয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও চাপে রয়েছে। দেশটির বড় শিয়া জনগোষ্ঠীর বিষয়টিও ইরানবিরোধী যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়াকে রাজনৈতিকভাবে জটিল করে তুলতে পারে।

তুরস্কের ক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত সৌদি আরবের পক্ষে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আঙ্কারার আগ্রহ মূলত প্রতিরক্ষা শিল্প, সামরিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামো সহযোগিতা সম্প্রসারণে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সামরিক সক্ষমতার বাজার বাড়ানোর সুযোগ হিসেবেও তুরস্ক মক্কা চুক্তিকে দেখেছিল বলে তারা মনে করেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এর আগে বলেছিলেন, চুক্তিটি মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন বার্তা বহন করবে। তবে বর্তমান সংকটে সেই ঘোষণার সামরিক প্রয়োগ এখনো দেখা যায়নি।

সব মিলিয়ে সৌদি আরব একদিকে হুতিদের হামলা এবং অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক চাপের মধ্যে নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতার মুখোমুখি। মিশর, পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন জানালেও এখন পর্যন্ত কার্যকর সামরিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। মিশর মক্কা চুক্তির আগের আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত জোটে যোগ দেয়নি।

সৌদি আরবের সঙ্গে আর্থিক ও জ্বালানি সহযোগিতার কারণে পাকিস্তানের ওপর দেশটির উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকলেও ইসলামাবাদকে সরাসরি যুদ্ধে নামানো সহজ হবে না বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। অন্যদিকে, বাব আল-মান্দেব ও ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় লোহিত সাগর হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহও নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চুক্তিটি এখনো বহাল থাকলেও এর বাস্তব সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সদস্য দেশগুলো রাজনৈতিক সমর্থন ও কূটনৈতিক সংহতি জানালেও পারস্পরিক সামরিক প্রতিরক্ষার যে ধারণা সামনে রেখে চুক্তিটি প্রচার করা হয়েছিল, তার বাস্তব প্রয়োগ এখনো দৃশ্যমান নয়।

এ কারণে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা ও পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

সদ্য সংবাদ/ এআর

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবিতে হেফাজতে ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিব সদ্য. সারাদেশে একযোগে ৯৯ বিচারককে বদলি সদ্য. শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণে সরকার কি উদ্যোগ নিয়েছে- জানতে চাইল সংসদীয় কমিটি সদ্য. আগামী মাস থেকে বাংলা কিউআরে সঙ্গে সঙ্গেই টাকা পাবেন বিক্রেতা সদ্য. বজ্রপাতে তিন জেলায় ৪ জনের মৃত্যু সদ্য. ডেঙ্গুতে আরও ৫ মৃত্যু, আক্রান্ত ৫৮ হাজার সদ্য. আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হাফেজদের সংবর্ধনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী সদ্য. বেনামি গণমাধ্যমের ফটোকার্ডে দেশ অস্থিতিশীলের চেষ্টা হলে ব্যবস্থা নেবে সরকার: আইনমন্ত্রী সদ্য. মক্কা চুক্তির পরপরই সৌদিতে হুতিদের হামলা, কঠিন পরীক্ষায় পাকিস্তান-তুরস্ক সদ্য. আসিফ মাহমুদ ও তার স্ত্রীর তথ্য ও নথি চেয়ে বিএফআইইউকে দুদকের চিঠি সদ্য. জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবিতে হেফাজতে ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিব সদ্য. সারাদেশে একযোগে ৯৯ বিচারককে বদলি সদ্য. শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণে সরকার কি উদ্যোগ নিয়েছে- জানতে চাইল সংসদীয় কমিটি সদ্য. আগামী মাস থেকে বাংলা কিউআরে সঙ্গে সঙ্গেই টাকা পাবেন বিক্রেতা সদ্য. বজ্রপাতে তিন জেলায় ৪ জনের মৃত্যু সদ্য. ডেঙ্গুতে আরও ৫ মৃত্যু, আক্রান্ত ৫৮ হাজার সদ্য. আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হাফেজদের সংবর্ধনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী সদ্য. বেনামি গণমাধ্যমের ফটোকার্ডে দেশ অস্থিতিশীলের চেষ্টা হলে ব্যবস্থা নেবে সরকার: আইনমন্ত্রী সদ্য. মক্কা চুক্তির পরপরই সৌদিতে হুতিদের হামলা, কঠিন পরীক্ষায় পাকিস্তান-তুরস্ক সদ্য. আসিফ মাহমুদ ও তার স্ত্রীর তথ্য ও নথি চেয়ে বিএফআইইউকে দুদকের চিঠি