দীর্ঘদিনের ছাত্ররাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রাম, হামলা ও কারাবরণের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়তার কারণে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আলোচনায় রয়েছেন বোরহান উদ্দিন ইশরাক। ঢাকা কলেজ থেকে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর প্রায় দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার দাবি করেছেন তিনি।
রাজনৈতিক জীবনে চারবার গুলিবিদ্ধ ও তিন দফায় কারাবরণের অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন ইশরাক। পাশাপাশি অসচ্ছল শিক্ষার্থী, এতিম ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হাফেজ শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার তথ্যও পাওয়া যায়।
ঢাকা কলেজ থেকে রাজনীতির শুরু
২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন বোরহান উদ্দিন ইশরাক। শুরু থেকেই ক্যাম্পাসের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি।
ইশরাকের দাবি, আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নিয়মিত ৫০ থেকে ৬০ জন কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন তিনি। সময়ের সঙ্গে তার কর্মী ও সমর্থকদের পরিসরও বাড়তে থাকে।
ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের ২ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক, সাংগঠনিক সম্পাদক ও প্রচার সম্পাদকসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সর্বশেষ ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।
চারবার গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবি
রাজনৈতিক জীবনে চার দফায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ইশরাক।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকায় একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় প্রথমবার গুলিবিদ্ধ হন তিনি।
এরপর ২০২৩ সালের ২৯ জুলাই নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলনের কর্মসূচিতে রাজধানীর মাতুয়াইল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা জানান তিনি।
একই বছরের ২৮ অক্টোবর বিএনপির একদফা আন্দোলনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে আবারও গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবি করেন ইশরাক।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় কাকরাইল এলাকায় সহযোদ্ধাদের সঙ্গে রাজপথে অবস্থানকালে গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা জানান তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ঘটনাই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার সময় ঘটেছে।
তিন দফায় কারাবরণ
রাজপথের কর্মসূচির পাশাপাশি তিন দফায় কারাবরণের অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন ইশরাক।
তার দাবি, ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার আদালতকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে হাইকোর্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন তিনি।
২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তির পর কারাগারের গেট থেকেই নতুন মামলায় পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানান তিনি।
এরপর ২০২১ সালের ২৮ জুন কাকরাইলের একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে গ্রেপ্তার হয়ে রমনা থানার মামলায় কারাবরণ করেন তিনি।
ইশরাকের হিসাব অনুযায়ী, তিন দফায় প্রায় নয় মাস কারাগারে থাকতে হয়েছে তাকে। কারাবাসের পাশাপাশি রিমান্ড ও শারীরিক-মানসিক চাপের অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড
রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন আন্দোলন, হরতাল, অবরোধ, মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন ইশরাক।
সরকারবিরোধী আন্দোলন, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও চিকিৎসার দাবিতে কর্মসূচি এবং তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচিতেও অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্ব পালনকে তার সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার অন্যতম অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সক্রিয়তার দাবি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনেও শুরু থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজপথে থাকার দাবি করেছেন ইশরাক।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সহযোদ্ধা ও জুনিয়র কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। একই সঙ্গে ওই আন্দোলনকে কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির পরিবর্তে দেশের সর্বস্তরের মানুষের বৃহত্তর গণআন্দোলন হিসেবে দেখার কথাও বলেছেন তিনি।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও সক্রিয়
রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পরও বিভিন্ন ইস্যুতে মাঠে থাকার দাবি করেছেন ইশরাক।
২০২৬ সালের ৮ আগস্ট সায়েন্সল্যাব মোড় থেকে তার নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি নীলক্ষেত এলাকা প্রদক্ষিণ করে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।
ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ এবং ক্যাম্পাসে সংঘাতের প্রতিবাদে ওই কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। কর্মসূচিতে ইশরাক ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানান এবং ক্যাম্পাসে প্রকাশ্য ও জবাবদিহিমূলক ছাত্ররাজনীতির পক্ষে বক্তব্য দেন।
এর আগে ২০২৬ সালের ২৭ জুন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কথিত নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের একটি বিক্ষোভ মিছিলেও তার অংশগ্রহণের কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে।
রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ড
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগেও যুক্ত থাকার কথা জানিয়েছেন ইশরাক।
অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা, এতিম শিক্ষার্থীদের খাবার বিতরণ এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হাফেজ শিক্ষার্থীদের পোশাক ও খাবার দেওয়ার মতো কর্মসূচি আয়োজন করেছেন তিনি।
২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে দারুন নাজাত আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানায় এতিম শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাবার বিতরণ এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
এ ছাড়া একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মোহাম্মদপুরের আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মাদ্রাসার হাফেজ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে পোশাক বিতরণ এবং মধ্যাহ্নভোজের আয়োজনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আলোচনায়
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ, সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয়তার কারণে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ইশরাকের নাম আলোচনায় এসেছে।
তার রাজনৈতিক পথচলায় যেমন রয়েছে আন্দোলনে সক্রিয়তা, গুলিবিদ্ধ ও কারাবরণের অভিজ্ঞতা, তেমনি রয়েছে সংগঠন পরিচালনা ও কর্মীদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা।
তবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে কারা দায়িত্ব পাবেন, সে সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক প্রক্রিয়া ও নেতৃত্বের মূল্যায়নের ওপর।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর এখন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে জায়গা করে নেওয়ার প্রত্যাশা করছেন বোরহান উদ্দিন ইশরাক। তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক ভূমিকা ও সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরেই সামনে আসছে সেই সম্ভাবনার আলোচনা।
সদ্য সংবাদ/এসকে