এক সময়ের শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ এখন ভয়াবহ মাদকের ছোবলে বিপর্যস্ত। জেলার বিভিন্ন অলি-গলি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, নদীর তীর, বস্তি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশ কোথাও যেন থামছে না মাদকের রমরমা বাণিজ্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলেও মাদক ব্যবসার মূল শিকড় উপড়ে ফেলা যাচ্ছে না। ফলে দিন দিন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে পরিস্থিতি।
জেলার রূপগঞ্জ, ফতুল্লা, আড়াইহাজার, সোনারগাঁ, সিদ্ধিরগঞ্জ,বন্দর ও সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে মাদকের ভয়াবহতা। কোথাও গোপনে, আবার কোথাও স্থানীয়দের চোখের সামনেই চলছে মাদক কেনাবেচা। মাদকাসক্তদের আনাগোনা ও মাদক ব্যবসায়ীদের তৎপরতায় অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।
স্থানীয়দের দাবি, নারায়ণগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থান ও নদীপথকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাদক জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করছে। বিশেষ করে শীতলক্ষ্যা নদীকে কেন্দ্র করে মাদক সরবরাহের একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নদীপথে আসা মাদক পরে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে জেলার বিভিন্ন স্পটে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান ও মাদক উদ্ধার করা হলেও সরবরাহের মূল উৎস ও বড় কারবারিদের অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, মাদকের বিস্তার এখন তরুণ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশেও মাদক বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মাদকের ভয়াবহ ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন অভিভাবকরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মাদকবিরোধী অভিযান শুধু বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মাদকের সরবরাহের পথ, গডফাদার, পাইকারি কারবারি ও খুচরা বিক্রেতাদের শনাক্ত করে একই সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নদীপথে নজরদারি আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পর কিছুদিন তৎপরতা কম থাকলেও পরবর্তীতে আবারও শুরু হয় একই কারবার। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে অভিযানের পরও কীভাবে একই এলাকায় আবার মাদক ব্যবসা সক্রিয় হয়ে ওঠে?
সচেতন নাগরিকদের মতে, মাদক শুধু একটি অপরাধ নয় এটি একটি সামাজিক ও প্রজন্মগত সংকট। মাদকের কারণে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই, কিশোর অপরাধ, পারিবারিক অশান্তি ও নানা ধরনের সামাজিক অবক্ষয়। একটি প্রজন্ম মাদকের কবলে পড়লে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পুরো সমাজের ওপর পড়তে পারে।
নারায়ণগঞ্জবাসীর দাবি, মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে মাদক সরবরাহের রুট বন্ধ, চিহ্নিত কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, নদীপথে নজরদারি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে নিয়মিত অভিযান চালানোর দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষায়, অভিযান হচ্ছে, মাদক উদ্ধার হচ্ছে, গ্রেপ্তারও হচ্ছে কিন্তু মাদকের বিস্তার থামছে না।আর এ কারণেই অনেকের আশঙ্কা, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে নারায়ণগঞ্জের মাদক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে মাদকের এই ভয়াল থাবা থেকে নারায়ণগঞ্জকে কে বাঁচাবে? স্থানীয়দের কেউ কেউ তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে আখ্যা দিচ্ছেন মাদকের আইসিইউতে নারায়ণগঞ্জ!
নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী জানান, মাদকের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। জেলার বিভিন্ন মাদক স্পট ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিষয়ে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে এবং চিহ্নিত মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, মাদক নির্মূলে শুধু খুচরা বিক্রেতা নয়, মাদকের সরবরাহ ও এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোনো এলাকায় মাদক মজুত বা বিক্রির তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান পরিচালনা করা হবে। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলেও জানান তিনি।
সদ্য সংবাদ/এসআর