দুপুর থেকেই শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছোট ছোট মিছিল ও দলীয় পতাকা নিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী কর্মীরা জড়ো হতে শুরু করেন। একসময় কৃষি ব্যাংক চত্বর পরিণত হয় লাল পতাকা ও স্লোগানে মুখরিত এক প্রতিবাদ-অভিযাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরউদ্দীন পাটোয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা, কেন্দ্রীয় নেতা সামান্তা শারমিনসহ অর্ধশতাধিক কেন্দ্রীয় নেতা ও নারায়ণগঞ্জের জেলা ও মহানগরের নেতৃবৃন্দ।
পথসভায় প্রধান বক্তা নাহিদ ইসলাম বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা বলেছিলাম, বাংলাদেশকে বদলাতে হবে, রাষ্ট্রের সিস্টেম পাল্টাতে হবে। সেই সিস্টেমের সবচেয়ে নগ্ন উদাহরণ নারায়ণগঞ্জ, যেখানে পরিবারতন্ত্র, গডফাদারতন্ত্র, মাফিয়াতন্ত্র ও দখলবাজি একাকার। আমরা সেই সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়ছি এবং লড়াই চলবেই।”
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নারায়ণগঞ্জে গতরাতে আমাদের জুলাই পদযাত্রার তোরণ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এই ব্যর্থতা জনগণের জানমালের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আওয়ামীলীগের সেই পুরোনো দখলদার গোষ্ঠী আবার পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে নারায়ণগঞ্জে।”
তিনি আরও বলেন, “নারায়ণগঞ্জের মানুষ বুকের রক্ত দিয়ে জুলাই অভ্যুত্থান সফল করেছিলো। ঢাকাবাসীকে রক্ষা করেছিলো। আজ নতুন লড়াই আসন্ন। সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি চলছে। আমরা জানি, নারায়ণগঞ্জবাসী আবারও সেই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেবে।”
পথসভায় দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “আওয়ামী লীগের সাথে যাদের ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল, তাদের কাছ থেকে আমরা কিছুই আশা করি না। আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন মানে আমাদের মৃত্যুর পরোয়ানা। আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনও আওয়ামী লীগের সাথে সুশীলতা দেখাতে পারি না, করবও না।”
তিনি আরও বলেন, “কেয়ামত হয়ে যাওয়ার পর যেমন তওবা কবুল হয় না, ঠিক তেমনি গোপালগঞ্জের ঘটনার পর আওয়ামী লীগের পাপ ধুয়ে ফেলা যাবে না। তাদের ক্ষমা চাওয়ার আর সুযোগ নেই। যারা আজ আবার সেই গডফাদারতন্ত্রের পুনর্বাসনের কথা বলেন, তারা ফ্যাসিবাদের নতুন এজেন্ট।”
তিনি সব ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নতুন বাংলাদেশের লড়াইয়ে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান।
পথসভায় সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা বলেন, “নারায়ণগঞ্জের মাটিতে যারা চাঁদাবাজি করে, সন্ত্রাস করে, জনবিরোধী শাসন কায়েম করে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী জনতার মিছিল থামানো যাবে না।”
সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, “হামলা করে আমাদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়া যাবে না। আমরা জানি এই শহরের মানুষ কখনও অন্যায় সহ্য করে না। এই শহর আবারও সেই ঐতিহাসিক লড়াইয়ের নতুন সূচনা করবে।”
তিনি আরও বলেন, “আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দল না, ভারতের দল। তাই তাঁরা যা দিয়েছে তা ভারত সারাজীবন মনে রাখবে বলেছে আওয়ামীলীগই।”
কর্মসূচির আগে থেকেই গোটা শহরে পুলিশের নজরদারি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের টহল ও অবস্থান করতে দেখা গেছে।
এদিকে, দুপুর থেকেই শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল বিজয় স্তম্ভ এলাকায় আসতে থাকে। উপস্থিত নেতাকর্মীরা স্লোগান দেন “মুজিববাদ মুর্দাবাদ, ইনকিলাব জিন্দাবাদ”, “চাঁদাবাজ আর দখলদার, বাংলা নয় তোর বাপ দাদার”, “কথায় কথায় বাংলা ছাড়, বাংলা কি তোর বাপদাদার” প্রভৃতি শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠে পুরো শহর। শহরের প্রধান প্রধান সড়ক জুড়ে ছিল এনসিপির পতাকা, ব্যানার ও ফেস্টুন।
অনেকের মতে, নারায়ণগঞ্জে এনসিপির এই পথসভা ও পদযাত্রা শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না, বরং এটি ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার পুনর্জাগরণ এবং একটি পুরনো দখলদার ও মাফিয়া শাসনের বিরুদ্ধে নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সূচনাবিন্দু।
এনসিপি নেতাদের ভাষ্যমতে, এই আন্দোলন এখন আর শুধু দলের নয়, বরং এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন। তাঁরা আগামীদিনে আরও বড় কর্মসূচির ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, “দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়, সেই পরিবর্তনের লড়াইয়ে জুলাই চেতনা শুধু অতীত নয়, আগামীদিনের শক্তিও।”