নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ফের আলোচনায়
‘পাগলা হামিদ’। এক সময়ের কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হামিদ
ওরফে পাগলা হামিদ এখন অবস্থান নিচ্ছেন বিএনপি নেতা ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি
জাকির খানের ছায়ায় এমন চিত্র উঠে আসায় শহরজুড়ে চলছে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা।
পঞ্চপটি এলাকার চাঁদনি হাউজিং ছিল
হামিদের অপতৎপরতার মূল কেন্দ্র। আজমেরী ওসমানের সন্ত্রাসী বলয়ে থেকে খুন, গুম,
চাঁদাবাজি, দখলদারি, হুমকি-ধামকি, এমন কোনো অপরাধ নেই যা হামিদের নাম জড়ায়নি।
পুলিশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায়ও এক সময় ছিল তার নাম। এলাকার সাধারণ মানুষ এক
সময় হামিদের নাম শুনলে আতঙ্কে কেঁপে উঠত।
গত ৫ আগস্ট, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এক
ব্যর্থ পরিকল্পনার দায়ে যখন আজমেরী ওসমান ও তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান,
তখন নারায়ণগঞ্জে এক ধরণের ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। এই সুযোগেই পুরোনো অনুসারীরা
নিজেদের রক্ষা করতে শুরু করেন নতুন রাজনৈতিক ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়ে। এমনই একজন
পাগলা হামিদ, যিনি আজমেরী না থাকলেও নিজেকে বাঁচাতে জুড়ে দিয়েছেন বিএনপির একটি
বলয়ের সাথে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে
ভাইরাল হওয়া একটি ছবিতে দেখা যায়—জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জাকির খান একান্ত
ভঙ্গিতে হামিদের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের উভয়ের হাস্যোজ্জ্বল মুখ এবং
পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা দেখে অনেকেই আঁচ করছেন, হামিদ এখন সরাসরি জাকির খানের ঘনিষ্ঠ
বলয়ে।
এই ছবি প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয়
সমালোচনার ঝড়। বিএনপির অনেক নেতাকর্মীই এই ঘটনায় ভীষণ বিব্রত এবং ক্ষুব্ধ। তাদের
মতে, একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসীকে দলের বলয়ে টেনে আনা যেমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত, তেমনি
তা বিএনপির 'নতুন নেতৃত্বের পরিচ্ছন্ন রাজনীতির' স্লোগানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
জেলা বিএনপি ও যুবদলের অভ্যন্তরে খোঁজ
নিয়ে জানা গেছে, জাকির খানের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেকেই অসন্তুষ্ট। অনেকেই বলছেন,
আজমেরীর মতো বিতর্কিত সন্ত্রাসীর অনুসারীদের জায়গা বিএনপির মতো একটি সংগঠনে নেই।
কিছু নেতাকর্মী ইতোমধ্যে আভ্যন্তরীণভাবে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে বিষয়টি অবগতও করেছেন
বলে সূত্রে জানা গেছে।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদল
নেতা বলেন, আজমেরীর সন্ত্রাসী বলয়ের
মানুষদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা কোনোভাবেই বিএনপির জন্য মঙ্গলজনক নয়। এতে আমাদের
রাজনীতির ইমেজ প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি হিসেবে
জাকির খান নারায়ণগঞ্জ বিএনপির যুব ও ছাত্র রাজনীতিতে একটি পরিচিত মুখ। তবে
সাম্প্রতিক সময় তার আশপাশে একাধিক বিতর্কিত ব্যক্তির আনাগোনা দেখা যাচ্ছে বলে
অভিযোগ রয়েছে। হামিদের সাথে সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসার পর, জাকির খানের রাজনৈতিক
অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
এমনকি দলের অভ্যন্তরেও আলোচনা শুরু
হয়েছে যে, জাকির খান কি আজমেরী ওসমানের সাবেক বলয়কে বিএনপির ছাতার নিচে এনে কোনো
বড় ধরনের পলিটিক্যাল ডিল' করতে যাচ্ছেন কিনা।
এক সময় যারা আজমেরীর হাত ধরে
নারায়ণগঞ্জে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন, তাদের আবার রাজনীতিতে পুনরাবির্ভাব
নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যেও দেখা দিয়েছে আশঙ্কা। অনেকে বলছেন, আমরা তো ভেবেছিলাম তারা পালিয়েছে, কিন্তু আবার
যদি ফিরে আসে, তাহলে তো আমাদের নিরাপত্তা ফের ঝুঁকিতে পড়বে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র বলছে, হামিদ
বর্তমানে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছেন এবং নিজেকে জাকির খানের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিচ্ছেন।
এ অবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে তার নামে
থাকা পুরনো মামলাগুলোর কী অবস্থা, সেটিও এখন আলোচনায় এসেছে।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে যেকোনো অপরাধী যদি পার
পেয়ে যায়, তাহলে জনগণের কাছে আইনের বার্তা কী দাঁড়াবে?
এই ঘটনার পর বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো
আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি আসেনি। তবে জেলা পর্যায়ের একাধিক নেতা বলছেন, তারা বিষয়টি
নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। অনেকে আবার এও
আশঙ্কা করছেন যে, এর ফলে বিএনপির নির্বাচনী কৌশলে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
রাজনৈতিক বোদ্ধারা তাঁদের বরাতে বলেন,
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে পাগলা হামিদের ‘পুনরায় আবির্ভাব’ কেবল একক কোনো সন্ত্রাসীর
ফিরে আসা নয় এটা স্থানীয় রাজনীতিতে পুরনো বলয়ের ‘ঘুরে দাঁড়ানোর’ একটা ইঙ্গিতও হতে
পারে। এই পুনর্গঠন যদি কোনোভাবে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ঘটে, তবে তা নারায়ণগঞ্জের
সাধারণ মানুষের জন্য যেমন অশনি সংকেত, তেমনি দলের জন্যও আত্মঘাতী হতে পারে।
তারা আরও বলেন, বিএনপির ভাবমূর্তি এবং
ভবিষ্যৎ কৌশল এখন নির্ভর করছে—তারা এই বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, এবং কিভাবে দলে
অনুপ্রবেশ ঠেকিয়ে নিজেদের শুদ্ধ করতে পারে। অন্যথায়, জনগণের আস্থা হারানো এবং
প্রতিপক্ষের তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।