বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও হল শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামীকাল মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর)। এ নির্বাচনের মাধ্যমে এক বছরের জন্য গঠিত হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শিক্ষার্থী প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন। সংকট কাটিয়ে নতুন দিনের সম্ভাবনার আশাবাদী শিক্ষার্থীরা।
কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের সময় ২০০৫ সালের ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন’-এ ছাত্র সংসদের বিধান না থাকায় ১৯ বছরেও কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জকসু নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া নেয় প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায়
গত ২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৯ তম সিন্ডিকেট সভায় জকসু খসড়া নীতিমালা অনুমোদন দেয় প্রশাসন। সর্বশেষ ২৭ অক্টোবর রাষ্টপতির অনুমোদন পায় জকসু নীতিমালা।
এক নজরে দেখে নেওয়া যাক রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে থেকেও আবাসন সুবিধাহীন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের বহুল আকাঙ্ক্ষিত জকসু নির্বাচনের আদ্যোপান্ত:
নির্বাচন ও সংসদের কাঠামো
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, জকসুর কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদে ২১ পদ ও হল শিক্ষার্থী সংসদে ১৩ পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের মাধ্যমে জকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের অধিকার, একাডেমিক ও আবাসন সমস্যা, পরিবহন, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ভূমিকা রাখবেন।
প্রার্থী ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র
জকসু নির্বাচনে মোট ৩৪ টি পদের বিপরীতে প্রার্থী হয়েছেন ১৮৭ জন। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদে ১৫৪ জন এবং হল সংসদে ৩৩ জন বিভিন্ন প্যানেল ও স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচন করছেন। কেন্দ্রীয় সংসদে পুরুষ প্রার্থী
১৩৬ জন এবং নারী প্রার্থী ১৮ জন। সদস্য পদে সবচেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষ্য করা গেছে। ৭ টি কার্যনির্বাহী সদস্য পদের বিপরীতে লড়ছেন ৫৭ জন প্রার্থী।
কেন্দ্রীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ পদ
সহ-সভাপতি (ভিপি): ৯ জন
সাধারণ সম্পাদক (জিএস): ৯ জন
সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস): ৮ জন
মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র সম্পাদক: ৪ জন
শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক: ৭ জন
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক: ৭ জন
সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক: ৭ জন
ক্রীড়া সম্পাদক: ৮ জন
পরিবহন সম্পাদক: ৪ জন
সমাজসেবা ও শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক: ১০ জন
পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক: ৬ জন
স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক: ৫ জন
ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক: ১৫ জন
আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক: ৫ জন
আন্তজার্তিক বিষয়ক সম্পাদক: ৮ জন
কার্যনির্বাহী সদস্য: ৫৭ জন
হল সংসদ নির্বাচন
বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হল শিক্ষার্থী সংসদে মোট ৩৩ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন। এদের মধ্যে:
সহ-সভাপতি (ভিপি): ৩ জন
সাধারণ সম্পাদক (জিএস): ৩ জন
সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস): ২ জন
সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক: ২ জন
সংস্কৃতি সম্পাদক: ৪ জন
পাঠাগার সম্পাদক: ২ জন
ক্রীড়া সম্পাদক: ২ জন
সমাজসেবা ও শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক: ৩ জন
স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক: ৪ জন
কার্যনির্বাহী সদস্য: ৮ জন
ভোটকেন্দ্র ও ভোটার সংখ্যা
কেন্দ্রীয় সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচনে মোট ৩৯টি কেন্দ্রে ১৭৮ টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদের জন্য ৩৮ টি এবং হল সংসদের জন্য ১টি ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি ১০০ জন ভোটারের জন্য একটি করে বুথ থাকছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ভোটকেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৯ টা থেকে বিকেল ৩ টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জকসু নির্বাচনে মোট ভোটার ১৬ হাজার ৪৪৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৮ হাজার ৪৭৯ জন এবং পুরুষ ভোটার ৮ হাজার ১৭০ জন।
হলে থাকা একজন নারী ভোটার হল সংসদের ১৩ পদের ভোটসহ মোট ৩৪ টি ভোট দিতে পারবে। অপরদিকে অন্যান্য ভোটাররা কেন্দ্রীয় সংসদের ২১ পদে ২১ টি ভোট দিতে পারবে।
ব্যালট পদ্ধতি ও ভোট গণনা
নির্বাচনে ভোট গ্রহণ করা হবে ওএমআর শিটে। ভোট গ্রহণ শেষে গণনা করা হবে মেশিন। নির্বাচন শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হবে ৩০ অথবা ৩১ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে।
প্যানেল ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ
জকসু নির্বাচনে চারটি পূর্ণাঙ্গ ও একটি আংশিক প্যানেল ঘোষণা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ছাত্রদল–ছাত্রঅধিকার পরিষদের যৌথ প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’, শিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’, বামপন্থী ও সামাজিক–সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ‘মওলানা ভাসানী ব্রিগেড’ এবং ছাত্রশক্তি সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান’—এই চারটি পূর্ণাঙ্গ প্যানেল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এছাড়া প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে ‘তরুণ শিক্ষার্থী ঐক্য’ নামে একটি আংশিক প্যানেলও জকসুর নির্বাচনকে ভিন্ন রকম আমেজ দিচ্ছে। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থীও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
প্রথমবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ নির্বাচন থেকে শিক্ষার্থীরা একটি কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষার্থী সংসদ প্রত্যাশা করছেন। আবাসন সংকট, পরিবহন সমস্যা, একাডেমিক পরিবেশ উন্নয়ন, ক্যাম্পাস নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় নির্বাচিত সংসদের সক্রিয় ভূমিকা দেখার আশা তাদের। অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, জকসুর মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে চলা আবাসন সমস্যারও সমাধান হবে। কেউ বলছেন, “নির্বাচন হলে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সমস্যা সামনে আসবে।”