বিশ্বের চলমান সংকটগুলো এতটাই গভীর হয়েছে যে সেগুলোর বিভাজন এখন যেন অতল গহ্বরে রূপ নিয়েছে। একই সঙ্গে সামরিক, অর্থনৈতিক কিংবা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এককভাবে কাজে লাগিয়ে কোনো পরাশক্তির পক্ষেই এসব সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বিদায়ী বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। হতাশা ও উদ্বেগে ভরা দীর্ঘ ভাষণে ৭৭ বছর বয়সী এই পর্তুগিজ কূটনীতিক তাঁর এক দশকের দায়িত্বকালের বৈশ্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
গুতেরেস বলেন, তাঁর দায়িত্ব পালনের এই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। এসব সংঘাতে বেসামরিক মানুষ হামলার শিকার হয়েছেন, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে এবং ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে। ত্রাণ ও সেবা কার্যক্রমে নিয়োজিত বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করার প্রবণতা বেড়েছে।
তাঁর মতে, ভূরাজনৈতিক বিভাজন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে এবং বৈষম্যও আগের চেয়ে প্রকট হয়েছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা কমে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এখন ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা। এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এর নির্মাতারাও অনেক ক্ষেত্রে এর গতি ও প্রভাব নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।
গাজা পরিস্থিতি তুলে ধরে ইসরায়েলের নাম সরাসরি উল্লেখ না করেই গুতেরেস বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর সেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তাঁর মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ে এমন পরিস্থিতি তিনি আগে দেখেননি।
পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গুতেরেস মনে করেন, বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জাতিসংঘকে নতুনভাবে সাজিয়ে একটি সর্বজনীন বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, মানবজাতি যখন নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতার বিদ্যমান কাঠামোও বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে।
বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, নিজেদের সক্ষমতাকে সীমাহীন মনে করার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, সামরিক সক্ষমতা দিয়ে একা শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না, অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না স্থিতিশীলতা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতিও এককভাবে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তি যেন পৃথক পৃথক বলয়ে বিভক্ত না হয় এবং আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা যেন বাড়তে না পারে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন জাতিসংঘ মহাসচিব। তাঁর ভাষায়, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা নিজেদের পরিবর্তন করতে পারছে না।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে অল্প কয়েকটি বহুজাতিক করপোরেশন ও বিপুল সম্পদের অধিকারী ব্যক্তির হাতে ক্রমেই বেশি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, তথ্যপ্রবাহ, প্রযুক্তির বিকাশ থেকে শুরু করে সমাজের নাগরিক পরিসরের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও তাদের প্রভাব বাড়ছে। একই সময়ে মানুষ ক্রমবর্ধমানভাবে যন্ত্রের ওপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছেড়ে দিচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। একসময় কল্পকাহিনির অংশ বলে বিবেচিত অস্ত্রও এখন বাস্তব সামরিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব কোন পথে এগোবে, সেই প্রশ্নও রাখেন গুতেরেস। তাঁর মতে, ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও কমতে থাকা সহযোগিতা বিশ্বকে আরও বিভক্ত করবে, নাকি জাতিসংঘের নেতৃত্বে ভারসাম্যপূর্ণ বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এগিয়ে যাবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি সব দেশের সমানভাবে শ্রদ্ধাশীল থাকার ওপর জোর দেন তিনি। গুতেরেস বলেন, মূল পরীক্ষা হলো ক্ষমতা আইনের অধীন থাকবে, নাকি আইনের বাইরে পরিচালিত হবে। দ্বিমুখী নীতি পরিহার করে আন্তর্জাতিক সনদ সমুন্নত রাখা এবং কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধের জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে গুতেরেস মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ খুলে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন। গাজায় জাতিসংঘের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করতে গত বছর আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) নির্দেশ দিয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে সহিংসতা, মানুষকে বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ এবং ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ শান্তির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ডের ফলে জাতিগত নিধনের আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে বলে সতর্ক করেন তিনি। তাঁর মতে, চলমান সংকটের সমাধানের সম্ভাবনা চোখের সামনে হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, রাশিয়ার আগ্রাসন জাতিসংঘ সনদের গুরুতর লঙ্ঘন এবং এর মাধ্যমে একটি স্বাধীন দেশের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে রাশিয়ার কয়েকটি অঞ্চলে বাড়িঘর, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ এবং পরিবহন অবকাঠামোয় হামলা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার ওপরও পড়ছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার কোনো স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকাকে অন্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন গুতেরেস। তহবিলের সংকট ও নানা সমালোচনা সত্ত্বেও জাতিসংঘই এমন একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ, যেখানে শক্তিশালী পক্ষগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নিজের মেয়াদে জাতিসংঘে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও তুলে ধরেন গুতেরেস। তিনি জানান, সংস্থাটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শীর্ষ নেতৃত্ব, প্রধান কার্যালয় এবং পেশাদার পদগুলোতে পুরুষের পাশাপাশি সমসংখ্যক নারী নিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
সমতার প্রসঙ্গ টেনে গুতেরেস বলেন, এটি কোনো কল্পনা বা স্বপ্ন নয়; বরং একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তের বিষয়। জাতিসংঘ যদি পরিবর্তিত হতে পারে, তাহলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সংসদ, সরকার এবং শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সদ্য সংবাদ/ এআর