জাতীয় নির্বাচনে জোটগত সমীকরণে আসন ভাগাভাগি করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভিন্ন কৌশলে এগোচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিটি সিটিতেই এককভাবে মেয়র প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। ইতোমধ্যে বেশিরভাগ সিটিতে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। কোথাও আনুষ্ঠানিকভাবে নাম ঘোষণা করা হয়েছে, আবার কোথাও স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত বলে জানা গেছে।
দলীয় সূত্র বলছে, স্থানীয় নির্বাচনকে স্থানীয়ভাবেই বিবেচনা করে প্রতিটি সিটিতে সংগঠনের সুপারিশ ও মাঠের অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে জাতীয় রাজনীতির জোটগত সমীকরণের পরিবর্তে স্থানীয় জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতাকে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। দীর্ঘদিন মহানগর রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেতা এর আগে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে নগর পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশসংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তাকে সক্রিয় দেখা গেছে।
ঢাকা দক্ষিণে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েমকে। জুলাই-পরবর্তী সময়ে তরুণদের মধ্যে আলোচিত এই নেতাকে ঘিরে দক্ষিণ সিটিতে নতুন ভোটারদের সমর্থন আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।
তবে দক্ষিণ সিটিতে সাদিক কায়েমের সম্ভাব্য প্রার্থিতা রাজনৈতিকভাবে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করেছে। কারণ একই সিটি এলাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ারও প্রার্থী হওয়ার আলোচনা রয়েছে। ফলে দুই তরুণ রাজনৈতিক মুখের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্থানীয় নির্বাচনে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালীর নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর হেলালী এর আগে চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সক্রিয়তা ও সাবেক জনপ্রতিনিধির অভিজ্ঞতাকে তার বড় শক্তি হিসেবে দেখছে দলটি।
বরিশাল সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে জামায়াতের প্রার্থী করা হয়েছে দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলালকে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ এই নেতাকে সামনে রেখেই বরিশাল নগরীতে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।
খুলনা সিটি করপোরেশনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নাম রয়েছে। এর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এই নেতার স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের পরও খুলনা অঞ্চলে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার সক্রিয়তা অব্যাহত রয়েছে।
রংপুর সিটি করপোরেশনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মহানগর আমির এটিএম আজম খানের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। জাতীয় নির্বাচনে জোটগত সমঝোতার কারণে প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর পর এবার স্থানীয় নির্বাচনে তাকে সামনে রেখেই মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনে জামায়াত ইতোমধ্যে ড. মুহাম্মদ হাফিজুর রহমানের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। গত ৬ মে টঙ্গীর তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা অডিটোরিয়ামে এক কর্মী সম্মেলনে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার তার নাম ঘোষণা করেন।
শিক্ষাবিদ ড. হাফিজুর রহমান দীর্ঘদিন তুরস্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। গাজীপুরের নগর সমস্যা সমাধান, যানজট, জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনী পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনেও প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। মহানগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ আবদুল জব্বারকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। গত ১৯ জুন নারায়ণগঞ্জের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান তার নাম ঘোষণা করেন।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল জব্বার বর্তমানে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য। দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে নারায়ণগঞ্জে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে প্রার্থী করেছে জামায়াত। গত ১১ আগস্ট তার নাম ঘোষণা করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক বিভিন্ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার কারণে তাকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
এদিকে সিলেট, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেনি জামায়াত। তবে স্থানীয় পর্যায়ের সূত্র অনুযায়ী, কুমিল্লায় মহানগর জামায়াতের আমির মোসলেহ উদ্দিন, সিলেটে জেলা নায়েবে আমির মাওলানা লোকমান আহমদ এবং ময়মনসিংহে মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যাপক শহীদুল্লাহ কায়সারকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে রাখা হয়েছে।
নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনেও মেয়র পদে প্রার্থী ঠিক করেছে জামায়াত। সেখানে সরকারি আজিজুল হক কলেজের সাবেক জিএস আ.খ.ম. আব্দুল মালেককে প্রার্থী করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি বগুড়া মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি এবং একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন।
দলটির স্থানীয় নেতারা বলছেন, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে দেশের সব পর্যায়ের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে তাদের। জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনেও সাংগঠনিক শক্তি কাজে লাগিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায় জামায়াত।
সব মিলিয়ে ১৩ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের প্রার্থী বাছাইয়ের চিত্রে দেখা যাচ্ছে- কোথাও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, কোথাও সাবেক জনপ্রতিনিধি, আবার কোথাও তরুণ ও শিক্ষাবিদদের সামনে আনা হচ্ছে। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ এবং নির্বাচনী মাঠে দলটির কৌশলই বলে দেবে, স্থানীয় ভোটে জামায়াত কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
সদ্য সংবাদ/এসকে