সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরার পাশাপাশি দেশের স্বার্থে গঠনমূলক পরামর্শ দেওয়ার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আবদুস সালাম। তিনি বলেছেন, সমালোচনা গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সরকারের কার্যক্রমে অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা উচিত নয়।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কাকরাইলে আইডিবি ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
আবদুস সালাম বলেন, সাংবাদিকতা সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই জনগণ ও দেশের প্রতি সাংবাদিকদের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি সমাজের অনিয়ম ও অসঙ্গতি তুলে ধরারও দায়িত্ব রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে সাংবাদিকদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের সমালোচনার মাধ্যমে সমাজের নানা সমস্যা সামনে আসে এবং সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়। তবে সমালোচনার পাশাপাশি কীভাবে সমস্যার সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে ইতিবাচক দিকনির্দেশনাও থাকা প্রয়োজন।
দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা নিয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
তার ভাষ্য, দীর্ঘ সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পর দেশে আবার গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির সুযোগ এসেছে। এই অগ্রযাত্রা যেন কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষকে সচেতন থাকতে হবে।
বর্তমান সরকারের সামনে থাকা বিভিন্ন সংকটের কথা তুলে ধরে আবদুস সালাম বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি, গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহসহ বিভিন্ন খাতে নানা সমস্যা ছিল। ব্যাংক খাতেও সংকট রয়েছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবও দেশের অর্থনীতিতে পড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়ছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের সময় প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আবদুস সালাম বলেন, দীর্ঘ সময় নতুন গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতের মতো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, অতীতে বিদ্যুৎ খাতের অর্থ ব্যয় নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব সমস্যা থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সময় লাগবে।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, সরকারের কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে সমস্যাগুলোর সমাধানে বাস্তবসম্মত পরামর্শও দিতে হবে। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই দীর্ঘদিনের গ্যাস, বিদ্যুৎ কিংবা অন্যান্য সংকটের পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনা নিয়েও কথা বলেন আবদুস সালাম। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় নগর ব্যবস্থাপনায় নানা সমস্যা ছিল। ব্যাটারিচালিত রিকশা, হকার ও জলাবদ্ধতার মতো বিষয়গুলো দীর্ঘদিনের। পুরান ঢাকার অনেক এলাকায় পরিকল্পিতভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেও ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও গ্রিন রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এক এলাকার রিকশা যেন অন্য এলাকায় গিয়ে যানজট তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া ঢাকার আশপাশের এলাকা থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং এসব যানবাহনকে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগের কথাও জানান ডিএসসিসি প্রশাসক। অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
হকারদের বিষয়ে আবদুস সালাম বলেন, মানুষের চলাচলের রাস্তা বা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হবে না। তবে নির্দিষ্ট দিন ও নির্ধারিত স্থানে হকারদের বসার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে হকারদেরও নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নাগরিকদের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে এ ধরনের কর্মসূচি সফল করা সম্ভব নয়। বাড়িঘর, ছাদ, আঙিনা ও আশপাশের ড্রেন পরিষ্কার রাখতে নগরবাসীকে এগিয়ে আসতে হবে।
কোথাও দীর্ঘ সময় পানি জমে না থাকে, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সদ্য সংবাদ/এসকে