নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত- দুই দিকেই বড় ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করতে বিভিন্ন শ্রেণির সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আলাদা সাতটি বিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ বা এসআরও জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়াকে অনলাইনভিত্তিক করতে আইবাস প্লাস প্লাস ব্যবস্থাকেও নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির পর বাস্তবায়নের কার্যক্রম আরও দ্রুত এগোবে। ইতোমধ্যে প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইনগত যাচাইয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ভেটিং প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করা হতে পারে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে যে সাতটি পৃথক এসআরও প্রস্তুত করা হচ্ছে, সেগুলোর আওতায় থাকবে সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সশস্ত্র বাহিনী এবং বিচার বিভাগ।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভিন্ন শ্রেণির চাকরিজীবীর বেতন কাঠামো প্রয়োগে প্রশাসনিক ও কারিগরি কিছু পার্থক্য রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই আলাদা এসআরও তৈরি করা হচ্ছে। প্রজ্ঞাপন জারির পর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিষয় চূড়ান্ত করা হবে।
তিনি জানান, সাতটি এসআরওতে সংশ্লিষ্ট শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং নতুন কাঠামো প্রয়োগের প্রয়োজনীয় বিধান নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি নতুন বেতন নির্ধারণের জন্য আইবাস প্লাস প্লাসের কারিগরি প্রস্তুতিও চলছে।
গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নবম পে-স্কেলে সরকারি চাকরির বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। নতুন কাঠামোতে ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ মূল বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। সরকার জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
আইবাসেই নির্ধারণ হবে নতুন বেতন
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে অন্যতম পরিবর্তন আসছে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতিতে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত চাকরিসংক্রান্ত তথ্য আইবাস প্লাস প্লাসে আরও পূর্ণাঙ্গভাবে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ বিভাগ।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় একজন সরকারি চাকরিজীবী অনলাইনে আইবাস প্লাস প্লাসে প্রবেশ করে তার চাকরিসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই ও পূরণ করতে পারবেন। সেখানে পদ, গ্রেড, বর্তমান মূল বেতন, চাকরিতে যোগদানের তারিখ, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেডসহ প্রয়োজনীয় তথ্য যুক্ত থাকবে।
তথ্য পূরণ ও যাচাই শেষ হলে নতুন পে-স্কেলের বিধান অনুযায়ী সফটওয়্যারই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর নতুন মূল বেতন এবং প্রযোজ্য ভাতার হিসাব নির্ধারণ করবে। এর ফলে নতুন বেতন কাঠামোয় কে কত বেতন পাবেন, তা নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে অনলাইনে জানার সুযোগ তৈরি হবে।
বর্তমানে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আইবাস প্লাস প্লাস ব্যবহার করা হচ্ছে। বেতন, পেনশন, বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি অনলাইন বেতন বিল, জিপিএফ, ঋণ ও আয়করসংক্রান্ত হিসাব এবং ইএফটির মাধ্যমে বেতন-পেনশন পরিশোধের মতো কার্যক্রমও এ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে।
নতুন পে-স্কেলে গ্রেড ও মূল বেতনের পাশাপাশি ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, ভাতা এবং বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য আলাদা বিধান থাকায় বিদ্যমান আইবাস ব্যবস্থাকে সেই অনুযায়ী আপডেট করা হচ্ছে।
অর্থ বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কাগজে-কলমে বেতন পুনর্নির্ধারণের পরিবর্তে তথ্যনির্ভর ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হবে। এতে বেতন নির্ধারণের জন্য হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে কর্মচারীদের বারবার যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। একই সঙ্গে হিসাবের ভুল, দ্বৈত সুবিধা কিংবা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের মতো ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
সব মিলিয়ে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে একদিকে নতুন বেতন কাঠামোর প্রশাসনিক বিধান তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় বেতন পুনর্নির্ধারণের প্রস্তুতিও চলছে। এখন প্রজ্ঞাপন জারি ও আইনগত ভেটিং শেষ হওয়ার পরই পুরো প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়নের দিকে এগোবে।
সদ্য সংবাদ/এসকে