আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে সামরিক পদক্ষেপের বদলে সংলাপ ও কূটনীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ গ্রহণ করেছে ব্রিকস। বিশ্বের যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের নিন্দা জানালেও ঘোষণায় কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন শেষে সম্মেলনের সভাপতি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আনুষ্ঠানিকভাবে যৌথ ঘোষণাটি প্রকাশ করেন।
ঘোষণায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিভিন্ন দেশের মধ্যকার বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। একতরফা সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতার পাশাপাশি সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ব্রিকস নেতারা।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে যৌথ ঘোষণার ভাষা নির্ধারণে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা ও মতপার্থক্য ছিল বলে জানা গেছে। বিশেষ করে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানের পার্থক্যের কারণে অভিন্ন বক্তব্যে পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
তবে ধারাবাহিক কূটনৈতিক আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত সদস্য দেশগুলো একটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছায়। এর ফলে এবারের শীর্ষ সম্মেলনে সর্বসম্মতভাবে যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
এর আগে মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। সেই প্রেক্ষাপটে এবার শীর্ষ সম্মেলনে ঐকমত্যে পৌঁছানোকে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’য় বৈশ্বিক বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল ও কার্যকর করার ওপর জোর দিয়েছেন নেতারা।
বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মতো প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও প্রভাব বাড়ানোর পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে ব্রিকস।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে ব্রাজিল ও ভারতের ভূমিকা আরও জোরদারের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য, কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
সন্ত্রাসবাদের সব ধরনের কর্মকাণ্ডেরও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ব্রিকস। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাণিজ্য সচল রাখা এবং নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে ঘোষণায়।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন ব্রিকস নেতারা। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানো এবং শুল্ক ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা কমানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্রিকসের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এবারের সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ জোটের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।
বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি বর্তমানে ব্রিকস সদস্য দেশগুলোতে বসবাস করে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও জোটটির উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি ও অর্থনীতিতে ব্রিকসের সম্মিলিত অবস্থানের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।
সদ্য সংবাদ/এসকে