দেশে সারের মজুত থাকলে কৃষক পাচ্ছেন না কেন, সংসদে বিরোধী দলের প্রশ্ন

সদ্য সংবাদ ডেস্ক
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:৩৮:৩২

দেশে প্রয়োজনের তুলনায় সার বেশি মজুত রয়েছে, সরকারের এমন দাবির মধ্যেই কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না কেন, তা নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, সার সংকটের পেছনে মূল কারণ ঘাটতি নয়; বরং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, ডিলার ব্যবস্থাপনার সমস্যা ও কালোবাজারি। সরকার অবশ্য বলছে, চাহিদার তুলনায় দেশে অতিরিক্ত সার রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধিতে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমানের দেওয়া নোটিশের ওপর আলোচনায় বিষয়টি উঠে আসে। ‘দেশজুড়ে তীব্র সার সংকটে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়া, কৃষকদের মধ্যে বিরাজমান আতঙ্ক এবং সম্ভাব্য খাদ্যসংকটের ঝুঁকি নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি নোটিশটি দিয়েছিলেন। দেশে সার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয় যৌথভাবে পালন করলেও এদিন সংসদে দুই মন্ত্রণালয়ের কোনো মন্ত্রী বক্তব্য দেননি।

আলোচনায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, স্বৈরাচার সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া অনেক সার ডিলার এখনো দায়িত্বে রয়েছেন, আবার অনেকে পলাতক। ফলে প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯টি ডিলার পয়েন্ট বর্তমানে শূন্য রয়েছে। বিতরণব্যবস্থা সচল রাখতে প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে নতুন ডিলার নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

মীর শাহে আলমের অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া কিছু ডিলার বিভিন্নভাবে সরকারকে হেয় করার পাশাপাশি কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আর করতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি। ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারের মজুতের তথ্য তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার মজুত বেশি।

তিনি আরও জানান, প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারে সারের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে কিছু সার পাচারের প্রবণতার তথ্য প্রশাসনের কাছে এসেছে। এ ধরনের দুটি ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

সার পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকায় কৃষকেরা আগামী মৌসুমের জন্য তা কিনতে পারছেন বলেও দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কৃষি বিভাগ ও সরকার প্রতিটি জেলায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার মজুতের ব্যবস্থা করেছে।

তবে সরকারের এই বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি সার। চলমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব খাদ্যনিরাপত্তায় পড়তে পারে। তাঁর প্রশ্ন, ২০২৬ সালের এই পরিস্থিতিতে সরকার যদি বলে প্রয়োজনের তুলনায় সার বেশি আছে, তাহলে কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না কেন এবং তাঁদের কালোবাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কেন?

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও রৌমারীতে কৃষকদের গোডাউন লুটের ঘটনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার না পাওয়ায় কৃষকদের অসন্তোষের বিষয়টিও সংসদে তুলে ধরেন মাহবুবুল আলম। তাঁর অভিযোগ, পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও কৃষকদের মধ্যে যে দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে, তা সরকারের ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। কালোবাজারি বন্ধ, ডিলার সিন্ডিকেট ভাঙা এবং কৃষকের কাছে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানান, সার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশের ৬৪ জেলায় ৬৪টি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দুজন যুগ্ম সচিব ও দুজন উপসচিব সরাসরি এসব কার্যক্রম তদারক করছেন। কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের পরিবর্তনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শূন্য পদে নতুন ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, আবেদনের শেষ তারিখ আগামীকাল। তাঁর মতে, আবেদন গ্রহণের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই অনিয়মের অভিযোগ তোলা অপ্রাসঙ্গিক।

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রতি ইঙ্গিত করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘যে সংসদ সদস্য সার নিয়ে কথা বলে সভা ত্যাগ করেছেন, উনার বক্তব্য শুনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উকিল আবদুস সাত্তারের কথা মনে পড়ে। উনার বেইমানির জন্য কপালে কী আছে তা আল্লাহই ভালো জানেন।’

সারের সংকট নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পত্রপত্রিকায় আসা সার সংক্রান্ত ২০-২২টি বিশেষ এলাকার ছোটখাটো সমস্যাগুলোকে ভিত্তি করে অসন্তোষ ছড়ানোর অপচেষ্টা চলছে। স্যাবোটাজ না করে জনগণের পক্ষে কীভাবে কাজ করা যায় সেদিকে নজর দেওয়া উচিত।’

দেশে সারের মোট মজুতের পরিমাণ ৫১ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন জানিয়ে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, চাহিদা পূরণের পরও ১৫ দশমিক ৮৪ লাখ মেট্রিক টন সার উদ্বৃত্ত থাকবে। কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী টাঙ্গাইল জেলায় প্রথম এই কার্ড উদ্বোধন করেছেন। এর মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা সহজ হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানো ও অপচয় ঠেকানো সম্ভব হবে। বিরোধী দলের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি যা বলে তা-ই পালন করে এবং কখনো জনগণের বিরুদ্ধে যায় না।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, দেশে পর্যাপ্ত সার থাকার যে দাবি করা হচ্ছে, সেটি তিনি স্বীকার করছেন। তবে প্রথম আলোর ‘ন্যায্য মূল্যের চেয়েও বেশি টাকা দিয়ে সার পাচ্ছে না কৃষক’ শিরোনামের প্রতিবেদনকে কোনো দলীয় প্রচারণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সার সংকটের সময় একজন মন্ত্রীর ব্যক্তিগত গোডাউন ভর্তি থাকার অভিযোগও তোলেন শফিকুল ইসলাম মাসুদ। এ প্রসঙ্গে তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের পরিস্থিতির কথা স্মরণ করে বলেন, তখন এক বস্তা সারের জন্য কৃষককে গুলির মুখে জীবন দিতে হয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য তুলে ধরে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শরিফুল আলম বলেন, দেশে সার উৎপাদন, আমদানি ও মজুত তিন ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) উৎপাদিত ও আমদানি করা সার কারখানা এবং বাফার গুদামে সংরক্ষণ করে। পরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী তা ডিলারদের কাছে সরবরাহ করা হয়।

তিনি জানান, বিসিআইসির সাতটি সার কারখানার মধ্যে বর্তমানে ঘোড়াশাল-পলাশ ও শাহজালাল সার কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড গ্যাস পাওয়ার পর উৎপাদন শুরুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

সারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মোহাম্মদ শরিফুল আলম বলেন, ‘বর্তমানে সারের কোনো সংকট নাই। সারের পর্যাপ্ত উৎপাদন, আমদানি, মজুত রয়েছে। সংকট তীব্র নয়, সার আছে। ব্যবস্থাপনা ত্রুটি কিছু থাকতে পারে।’

অন্যদিকে নোটিশদাতা জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান সরকারের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, তাঁরা সরকারের বক্তব্য বিশ্বাস করতে চান। কিন্তু জ্বালানি সংকটের সময়ও সরকার দেশে কোথাও লোডশেডিং নেই বলে জানিয়েছিল। তাই এখন সরকারের বক্তব্য কতটা বিশ্বাস করা উচিত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

নাজিবুর রহমান বলেন, ‘সরকারের সাফল্য এবং ব্যর্থতা তার ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। বলতে বাধ্য হচ্ছি, সরকার সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। সার কারখানাগুলোকে বন্ধ রেখে বেশি দামে জনগণের টাকায় আপনারা সার কিনছেন, বলছেন মজুত আছে ঠিকই আছে, কিন্তু এটা কৃষকের হাতে পৌঁছাতে পারছে না কেন? এটাই আপনাদের ব্যর্থতা। জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকটে যা লক্ষ্য করেছি, সারের সংকটের ক্ষেত্রেও আমরা একই বিপর্যয় লক্ষ্য করছি।’

সদ্য সংবাদ/ এআর

জাতীয় ব্রেকিং

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. দেশে সারের মজুত থাকলে কৃষক পাচ্ছেন না কেন, সংসদে বিরোধী দলের প্রশ্ন সদ্য. অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি শ্বেতপত্রের আলোকেই পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী সদ্য. বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট হবে না, এটা হতেই পারে না: সংসদে রুমিন ফারহানা সদ্য. মেট্রোরেলের ৪৬ পিলারে ফাটল, ২৭ বিয়ারিং প্যাডে গুরুতর ত্রুটি: সংসদে সড়কমন্ত্রী সদ্য. নতুন ১৫০ গ্যাসকূপ খননে বড় পরিকল্পনা ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর সদ্য. রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের পদবিতে ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা সদ্য. মাধ্যমিকের শিক্ষকদের জন্য জরুরি নির্দেশনা জারি মাউশির সদ্য. ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াতের মেয়র পদে আলোচনায় যারা সদ্য. চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক সালাহউদ্দিন ওএসডি সদ্য. ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনতে সময় লাগবে সাত বছর: প্রধানমন্ত্রী সদ্য. দেশে সারের মজুত থাকলে কৃষক পাচ্ছেন না কেন, সংসদে বিরোধী দলের প্রশ্ন সদ্য. অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি শ্বেতপত্রের আলোকেই পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী সদ্য. বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট হবে না, এটা হতেই পারে না: সংসদে রুমিন ফারহানা সদ্য. মেট্রোরেলের ৪৬ পিলারে ফাটল, ২৭ বিয়ারিং প্যাডে গুরুতর ত্রুটি: সংসদে সড়কমন্ত্রী সদ্য. নতুন ১৫০ গ্যাসকূপ খননে বড় পরিকল্পনা ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর সদ্য. রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের পদবিতে ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা সদ্য. মাধ্যমিকের শিক্ষকদের জন্য জরুরি নির্দেশনা জারি মাউশির সদ্য. ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াতের মেয়র পদে আলোচনায় যারা সদ্য. চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক সালাহউদ্দিন ওএসডি সদ্য. ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনতে সময় লাগবে সাত বছর: প্রধানমন্ত্রী