যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, সামরিক অভিযান ও নৌ অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি এবং সামরিক কাঠামো সংকটের মুখে পড়েছে বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন। দেশটির দাবি, আর্থিক সংকটের কারণে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সদস্যদের বেতন পরিশোধে সমস্যায় পড়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে তেহরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে তেহরানের বক্তব্য, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ইরানের অর্থনীতি টিকে আছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না দেশটি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেন, সামরিক হামলার পাশাপাশি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ দেশটির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২৫ বিলিয়ন ডলারের ইরানি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আটকে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়ায়ও সহায়তা করেছে ওয়াশিংটন।
কুপারের ভাষ্য, এসব পদক্ষেপের ফলে আইআরজিসি তাদের সদস্যদের বেতন দিতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের সমর্থনপুষ্ট সশস্ত্র সংগঠনগুলোও অর্থের অভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যার মুখে পড়ছে। এমনকি এসব সংগঠনের কয়েকটি নিজেদের যোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে আইআরজিসিকে অর্থ পাঠাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তুলে ধরা এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে—এমন কোনো তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণা প্রধান মাইকেল নাইটসের মতে, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতিরা দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক সংকট মোকাবিলা করছে। ইরাকের কয়েকটি ইরানপন্থী সংগঠনের তুলনায় তাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও দুর্বল। নাইটস জানান, ইরাকে বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে ইরানি পণ্য বিক্রির মাধ্যমে দেশটিতে সক্রিয় ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অর্থ সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, ইরাকভিত্তিক ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র সংগঠন কাতায়েব হিজবুল্লাহ ইরানের সহায়তায় দেশটির সম্পদ ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, চলতি মাসে প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি সূত্রের বরাতে বলা হয়, গত সেপ্টেম্বরে হিজবুল্লাহকে ২০০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে ইরান। তবে ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।
সংকটের মুখে ইরানের অর্থনীতি
যুদ্ধের প্রভাব, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কারণে ইরানের অর্থনীতি বেশ কয়েক বছর ধরে চাপে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার দরপতন, কম বেতনের চাকরি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্নতার প্রভাব পড়ছে দেশটির প্রায় ৯ কোটি মানুষের জীবনযাত্রায়।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ইরানের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৭ দশমিক ৭ শতাংশ কমে যেতে পারে।
তবে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান আবদোলনাসের হেম্মাতি মনে করেন, প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও দেশটির অর্থনীতি টিকে থাকার সক্ষমতা দেখিয়েছে। অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ছে এমন ধারণাকে তিনি ‘ভ্রম’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
গত ১৮ অক্টোবর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বীকার করেন, সামরিক হামলা ও নৌ অবরোধের কারণে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এ পরিস্থিতি মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পেজেশকিয়ানের দাবি, জ্বালানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে বছরে ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য পেট্রল আমদানির প্রয়োজন এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে অর্জিত রাজস্বের একটি অংশ ইলেকট্রনিক খাদ্য ভাউচারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোর্তাজাভির মতে, অর্থনৈতিক চাপ ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর ফলে আইআরজিসির কৌশলগত অবস্থানে মৌলিক পরিবর্তন আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আর্থিক সংকটের কারণে তেহরান আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না।
সদ্য সংবাদ/এআর