উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় উদ্যোগ পরিচালনা এবং নির্বাহী শাখার নীতিগুলো সমন্বয়ের লক্ষ্যে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স’ (এসআইএফ—SIF) নামে নতুন একটি ফেডারেল টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রশাসনের একটি নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আদেশটিতে নির্বাহী শাখার সরকারি কার্যক্রমে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘এআই’ শব্দের পরিবর্তে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ এবং ‘এসআই’ শব্দ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, সুপার ইন্টেলিজেন্স নিয়ে হোয়াইট হাউসের ঐতিহাসিক চুক্তির পর এই নতুন বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই চুক্তিতে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন জনগণের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব নিশ্চিত করতে একমত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
‘ইনাগুরেটিং দ্য এরা অব সুপার ইন্টেলিজেন্স’ শিরোনামের নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, আইনের অনুমোদিত সীমার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সরকারি কার্যক্রমে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘এআই’ শব্দটি ব্যবহার কিংবা স্বীকৃতি দেবে না।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, নাগরিক সমাজ, নিরাপত্তাবিষয়ক সংগঠন ও বেসরকারি শিল্পখাতের সঙ্গে সরকারের কেন্দ্রীয় যোগাযোগকারী হিসেবে কাজ করবে এসআইএফ। পাশাপাশি সুপার ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখতে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও ফেডারেল সরকারের উদ্যোগগুলোর মধ্যে সমন্বয় করবে সংস্থাটি।
ট্রাম্প বলেন, ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম সমন্বয়ের মাধ্যমে সুপার ইন্টেলিজেন্সে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব নিশ্চিত করাই এসআইএফের অন্যতম দায়িত্ব। তাঁর মতে, এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব শিল্পবিপ্লব ও ইন্টারনেটের চেয়েও ব্যাপক হতে পারে এবং এর সুফল মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে।
ভোক্তা, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সরবরাহকারী এবং সুপার ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কাজ করা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ফেডারেল সরকারের যোগাযোগও সমন্বয় করবে নতুন এই টাস্কফোর্স।
এসআইএফ পরিচালনার জন্য চার সদস্যের একটি নেতৃত্ব কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে জাতীয় গোয়েন্দা, প্রতিরক্ষা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ফেডারেল জনবল ব্যবস্থাপনার প্রতিনিধিরা থাকবেন। নেতৃত্ব দলে রয়েছেন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক জে ক্লেটন, ফেডারেল ট্রেড কমিশনের চেয়ারম্যান অ্যান্ড্রু ফার্গুসন, চিফ টেকনোলজি অফিসার ও গবেষণা এবং প্রকৌশলবিষয়ক যুদ্ধবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি এমিল মাইকেল এবং অফিস অব পারসোনেল ম্যানেজমেন্টের পরিচালক স্কট কুপর।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই চার সদস্যের নেতৃত্ব দল সরাসরি প্রেসিডেন্ট এবং চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসের কাছে প্রতিবেদন দেবে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে স্বাক্ষর করা নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আইনের টাইটেল ১৫-এ থাকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিদ্যমান আইনগত সংজ্ঞা সাময়িকভাবে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’-এর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হবে।
একই আদেশে প্রেসিডেন্টের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সহকারীকে (এপিএসটি—APST) ৬০ দিনের মধ্যে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’-এর একটি হালনাগাদ ফেডারেল আইনগত সংজ্ঞা নির্ধারণের জন্য প্রস্তাবিত আইনি ভাষা কংগ্রেসে জমা দিতে বলা হয়েছে। বিদ্যমান মার্কিন আইনগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর সুপারিশ করার নির্দেশও রয়েছে।
এর আগে হোয়াইট হাউসে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন ট্রাম্প। এতে স্পেসএক্স ও টেসলার প্রধান ইলন মাস্ক, মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ, গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই এবং এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াংসহ প্রযুক্তি খাতের অন্য নেতারা অংশ নেন।
ওই বৈঠকে ট্রাম্প উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতিকে মানবজাতির জন্য একটি নজিরবিহীন নতুন যুগের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রভাবকে ইন্টারনেটের চেয়েও বড় বলে উল্লেখ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এর ব্যাপক ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
বৈঠকের পর প্রযুক্তি খাতের নির্বাহী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিরাপদ উপায়ে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হোয়াইট হাউসের একটি চুক্তি নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
মেটার সিইও মার্ক জাকারবার্গ বলেন, প্রযুক্তিটি প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে—এ বিষয়ে মার্কিন জনগণ ও গ্রাহকদের আস্থা দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।
অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদেইও নিরাপদভাবে এই প্রযুক্তির উন্নয়নে সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে পারে।
জাতীয় নিরাপত্তার প্রসঙ্গ তুলে ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক জে ক্লেটন বলেন, এআই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ধরে রাখাই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—এ বিষয়ে বৈঠকে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।
সূত্র: গালফ নিউজ