নাটোরের গুরুদাসপুরে ধর্ষণ মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত শিক্ষক ফিরোজুল ইসলাম (৪৮) উচ্চ আদালত থেকে জামিনে কারাগার থেকে বের হওয়ার পর মামলার বাদীকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহী কারাগার থেকে গত মঙ্গলবার রাতে মুক্তির পর শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে তাঁকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান সমর্থকেরা। এ সময় উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. মানুষ রানাসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
জামিনে মুক্তির পরদিন বুধবার উপজেলার নাজিরপুরে একটি সভায় বক্তব্য দেন ফিরোজুল। সেখানে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি মামলার বাদী ও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেন।
সভায় ফিরোজুল ইসলাম বলেন, চারজনের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, নাজিরপুরে উপস্থিত কয়েক হাজার মানুষও প্রতিপক্ষের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছেন। তিনি বলেন, বিচার শুরু হয়েছে এবং নাজিরপুরের মাটিতেই সেই বিচার হবে।
ফিরোজুলের বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা ও মামলার বাদী অভিযোগ করেন, জামিনে বের হওয়ার পর থেকেই তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। নাজিরপুরের মাটিতেই বিচার করার কথা বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আতঙ্কে থাকার কথা জানিয়ে বিষয়টি থানায় অবহিত করেছেন বলেও জানান বাদী।
গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব ও সাবেক পৌর চেয়ারম্যান মো. আমজাদ হোসেন বলেন, ফিরোজুল ইসলাম একসময় বিএনপির সক্রিয় নেতা ছিলেন। উপজেলা পর্যায়ে দায়িত্বশীল পদেও ছিলেন তিনি। তবে বিভিন্ন বিতর্কের কারণে পরবর্তী সময়ে পদ হারান।
রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি মুন্সি আবুল কালাম আজাদ জানান, ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রধান শিক্ষক ফিরোজুল ইসলামকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। একই মামলায় অপহরণের ঘটনায় পৃথক ধারায় তাঁকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডও দেওয়া হয়। আদালতের ওই রায়ে নির্যাতিত শিক্ষার্থীর পরিবার সন্তুষ্ট ছিল। তবে আসামি উচ্চ আদালতে আপিল করে জামিনে মুক্তি পাওয়ায় বাদীর পরিবার আতঙ্কের মধ্যে পড়েছে বলে জানান তিনি।
গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান বলেন, ধর্ষণ মামলার বাদীকে অন্যায়ভাবে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে এবং তা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, গুরুদাসপুর উপজেলার একটি গ্রামের ওই ছাত্রী নাজিরপুর মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। ২০২২ সালের ১ অক্টোবর এসএসসি পরীক্ষার ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে বিদ্যালয়ে গেলে ফটকের সামনে থেকে প্রধান শিক্ষক ফিরোজুল ইসলাম তাকে জোর করে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যান। পরে তাকে রাজশাহীর একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ করা হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা পরে বিষয়টি ভুক্তভোগীর পরিবারকে জানান। এরপর ওই ছাত্রীর বাবা গুরুদাসপুর থানায় বাদী হয়ে ফিরোজুল ইসলাম ও তাঁর দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করেন। মামলার পর ১১ অক্টোবর রাত সোয়া ১২টার দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার তকীতলার একটি আবাসিক হোটেল থেকে তৎকালীন র্যাব-৫-এর সদস্যরা প্রধান শিক্ষক ফিরোজুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেন।
ফিরোজুল ইসলাম গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন। আদালতে দণ্ডিত হওয়ার পর তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
সদ্য সংবাদ/ এআর