সাব্বির হোসেন
২০২০
সালের শুরুর দিকে যখন বিশ্বজুড়ে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাস, তখন
বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিণত হয় এক ভয়ঙ্কর হটস্পটে। প্রতিদিন আক্রান্ত ও
মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। চারপাশে একপ্রকার মৃত্যুপুরীর
চিত্র। হাসপাতাল থেকে কবরস্থান, চারদিকে শুধুই কান্নার রোল।
এই ভয়াবহ
সময়েও যখন নিজের প্রিয়জনদের দাফন, সৎকারেও হাত গুটিয়ে নিচ্ছিলেন অনেকেই, তখন দৃঢ়
মনোবল আর সাহস নিয়ে একঝাঁক স্বেচ্ছাসেবীর সঙ্গে মাঠে নেমেছিলেন একজন সাহসিনী নারায়ণগঞ্জ
জেলা মহিলাদলের সহ-সভাপতি করোনা যোদ্ধা রোজিনা আক্তার। নিজ হাতে করোনায় মৃতদের
দাফন করেছেন, সেবা দিয়েছেন আক্রান্তদের, ছুটে গিয়েছেন যখন সবাই দূরে সরে গেছেন।
সেসময় নারায়ণগঞ্জে
প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মিছিল। আত্মীয়-স্বজন পর্যন্ত কাছে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন। এই কঠিন
সময়ে স্বেচ্ছাশ্রমে মরদেহ বহন, গোসল ও দাফন কাজে অংশ নেন রোজিনা। পিপিই পরে দীর্ঘ
সময় কবরস্থানে কাটিয়ে দিতেন, তবুও ক্লান্ত হননি। অনেক সময় আক্রান্ত রোগীর জন্য
অক্সিজেনের ব্যবস্থাও করেছেন তিনি। নিজ উদ্যোগে মাস্ক ও স্যানিটাইজার বিতরণ করেছেন
নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে।
বর্তমানে
আবারও দেশে করোনাভাইরাসের উপসর্গ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন
ভ্যারিয়েন্টগুলো আগের তুলনায় দ্রুত ছড়াচ্ছে। নারায়ণগঞ্জেও কিছু হাসপাতাল ও
ক্লিনিকে করোনা উপসর্গ নিয়ে রোগী ভর্তি হওয়ার হার বাড়ছে বলে জানিয়েছে সিভিল
সার্জনের দপ্তর। যদিও এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে
সাধারণ মানুষের মধ্যে।
এই
পরিস্থিতিতে পুনরায় প্রস্তুত হচ্ছেন করোনা যোদ্ধা রোজিনা আক্তার। আগের অভিজ্ঞতা
থেকেই এখন তিনি আরও দক্ষ। স্থানীয় প্রশাসন ও কয়েকটি মানবিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয়
করে কাজ শুরুর পরিকল্পনা করছেন তিনি। এমনটাই তিনি তার ফেসবুকে পোস্ট করে জানিয়েছেন
নারায়ণগঞ্জবাসীকে।
রোজিনার পরিবারের
সাথে কথা বললে জানাযায়, রোজিনার করোনা যুদ্ধ শুরুতে তার পরিবারের তীব্র আপত্তি
ছিল। মা, স্বামী ও সন্তানেরা চেয়েছিলো—তিনি ঘরেই থাকুন। কিন্তু মানুষের জন্য কিছু
করার তাগিদই তাকে এই কাজের পথে ঠেলে দিয়েছিল। ধীরে ধীরে পরিবারেরাও বুঝে যায়,
রোজিনা শুধু একজন মা বা স্ত্রী নন,তিনি একজন মানবিক যোদ্ধা।
রোজিনার আক্তারের
এলাকার বেশকিছু স্থানীয়দের সাথে কথা বললে তারা জানায়, রোজিনা আপা মামেই একজন সাহসী
যোদ্ধা। ২০২০ সালের সেই দুঃসময় পার হওয়ার পর রোজিনা এখন নারায়ণগঞ্জের এক পরিচিত মুখ।
করোনা কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগ—মানবিক সংকট দেখলেই সবার আগে ছুটে যান তিনি। পাড়ায়
পাড়ায় মানুষ জানে, ‘রোজিনা আপা’ মানেই ভরসা। করোনাভাইরাস আবারও হুমকি হয়ে দেখা
দিলেও নারায়ণগঞ্জের মানুষ জানে, তাদের পাশে আছেন কিছু অদম্য সাহসী মুখ—তাদের একজন
রোজিনা আক্তার। তিনি যেন আমাদের কাছে শুধু একজন করোনা যোদ্ধাই নন, বরং মানবতার এক
উজ্জ্বল প্রতীক।
নগরীর সচেতন
মহলের দাবি রোজিনা ও তার মতো যেসব মানবিক যোদ্ধারা দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ান,
তাদের জন্য সরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, সহায়তা ও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির ব্যবস্থা
থাকা দরকার। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পনগরীতে ভবিষ্যতের যেকোনো সংক্রমণ
মোকাবেলায় স্থানীয়ভাবে সংগঠিত প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী টিম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোজিনার
ভাষায়, "করোনা শুধু একটা ভাইরাস না, এটা মানুষের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
আমি চেয়েছি সেই ভয় দূর করতে।" মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই আমি এগিয়ে গিয়েছিলাম। আবারও যদি আমার শহর এমন ভাইরাসে
আক্রান্ত হয় তখনও নারায়ণগঞ্জবাসীর নিজেকে উৎসর্গ করতে দ্বিধা করবোনা।