জবিতে শিক্ষকদের পদোন্নতি বোর্ডের তালিকায় জুলাই আন্দোলনবিরোধী আওয়ামীপন্থী ৭ শিক্ষক

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:৩১
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত এবং জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীবিরোধী অবস্থানে থাকা কয়েকজন শিক্ষককে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আগামী ১০ মে থেকে ১৯ মে পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের পদোন্নতি বোর্ডের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব বোর্ডে ১২টি বিভাগের মোট ১৫ জন শিক্ষকের পদোন্নতির কথা রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৭ জন শিক্ষককে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ এবং জুলাইয়ের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানবিরোধী অবস্থানের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে জবিতে আয়োজিত নীল দলের মানববন্ধনে এসব শিক্ষক অংশ নেন। মানববন্ধনে তারা ছাত্র-জনতার এক দফা আন্দোলনকে ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান।

পদোন্নতির তালিকায় থাকা আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা হলেন— প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোছা. উম্মে হাবিবা খাতুন, ফার্মেসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর ড. মো. মনির হোসেন, বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাবিনা ইয়াসমিন, আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তফা হাসান, মার্কেটিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বিদ্যুৎ কুমার বালো, দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাজিয়া আফরিন এবং সিএসই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সজীব সাহা। তারা সবাই জবির আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘নীল দল’-এর সদস্য।

অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার দুই দিন আগে, ৩ আগস্ট গণভবনে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহত করার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে জবির আওয়ামীপন্থী নীল দলের শিক্ষকরা অংশ নেন। সেখানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘অশুভ শক্তির কবল’ থেকে ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। এর পরদিন ৪ আগস্ট থেকে জবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাধা, হুমকি ও নিরুৎসাহিত করার অভিযোগ ওঠে।

এই শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ মদদে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশও ছাত্রলীগের পরিচয় ব্যবহার করে ছাত্র-জনতার এক দফা দাবির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্দোলনের সময় ক্যাম্পাসে লাঠি ও পাইপ নিয়ে অবস্থান নেওয়ার ঘটনাও সামনে আসে।

৪ আগস্টের মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা কামাল বলেন, “এই বাংলাদেশে অরাজকতা সৃষ্টি করবেন না। দেশকে যারা আফগানিস্তান বানাতে চান, তাদের ফাঁদে পা দেবেন না।” তিনি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

জানা গেছে, অভিযুক্ত ৭ শিক্ষকের মধ্যে তিনজন সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে এবং চারজন সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতে যাচ্ছেন। এছাড়া আরও কয়েকজন শিক্ষককে অধ্যাপক গ্রেড-১ ও গ্রেড-২ পদে উন্নীত করার প্রস্তুতি চলছে।

অভিযোগ রয়েছে, ফার্মেসি বিভাগের ড. মনির হোসেন, মার্কেটিং বিভাগের বিদ্যুৎ কুমার বালো এবং দর্শন বিভাগের সাজিয়া আফরিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সরাসরি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া তালিকাভুক্ত সাত শিক্ষকই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনবিরোধী পোস্ট দেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ফার্মেসি বিভাগের ড. মনির হোসেন সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি সহকারী প্রক্টরের দায়িত্ব পান বলে অভিযোগ রয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সময় নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং মার্কেটিং বিভাগের দুই শিক্ষার্থীকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে কোতোয়ালি থানায় সোপর্দ করার পেছনেও তার ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

জুলাই আন্দোলনের সময় জকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রবিষয়ক সম্পাদক নূরনবীকে ধরে দেওয়ার ঘটনায়ও ড. মনির হোসেনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। সে সময়ের একটি ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া সহকারী প্রক্টর থাকাকালে ক্যাম্পাসসংলগ্ন অপরাধচক্রের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী শাসনামলে বিএনপি-জামায়াতপন্থী ট্যাগ দিয়ে অনেক শিক্ষকের পদোন্নতি ও নিয়োগ বোর্ড শেষ মুহূর্তে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকে বঞ্চিত হন। অথচ এখন আন্দোলনবিরোধী শিক্ষকদেরই পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে।

তারা বলেন, “উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ উদ্‌দীন নিজেও আওয়ামী আমলে নিপীড়নের শিকার ছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থান না হলে তিনি আজ উপাচার্য হতে পারতেন না। অথচ এখন নীল দলের নেতারা তদবির করে গুরুত্বপূর্ণ পদ ও পদোন্নতি নিচ্ছেন।”

এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনকে যারা সহযোগিতা করেছে এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। জগন্নাথ ছাত্রদল ফ্যাসিস্টদের তালিকা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছে। বর্তমান প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) ভিপি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “জুলাই বিপ্লবের সময় যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন করেছে, ক্লাসরুমে হেনস্তা করেছে, মানসিকভাবে টর্চার করেছে, তাদের পদোন্নতি জুলাইয়ের চেতনার সঙ্গে প্রতারণা।”

তিনি আরও বলেন, প্রশাসন যদি এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করে, তাহলে শিক্ষার্থীরা তা প্রতিহত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।

জবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক বলেন, “আমরা বিষয়টি আগে জানতাম না। আপনার মাধ্যমেই জানতে পারলাম। যদি সত্যিই এমন হয়, আমরা এর বিরোধিতা করব।”

পদোন্নতি বোর্ডের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শারমিন বলেন, “এখনো বোর্ড বসেনি। বোর্ড বসলে দেখা যাবে কাকে পদোন্নতি দেওয়া হবে। কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকলে সেটি বিবেচনায় আসতে পারে।” তিনি এ বিষয়ে উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন বলেন, “তারা কর্মরত শিক্ষক বা কর্মকর্তা। ৫ আগস্টের পর প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধান কমিটি কাজ করছে, তবে এখনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন আসেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পদোন্নতি বোর্ড একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রশাসনের দায়িত্ব হলো নিয়ম অনুযায়ী যোগ্যদের তালিকাভুক্ত করা। কারা কী অবস্থানে ছিলেন, তা নির্ধারণের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। প্রমাণ ছাড়া কাউকে আটকে দেওয়া প্রশাসনিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে প্রশাসন অবশ্যই বিষয়টি বিবেচনায় নেবে।”

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি নয়, দুটি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে: নয়াদিল্লি সদ্য. গণতন্ত্র রক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব: রাষ্ট্রপতি সদ্য. মানবতাবিরোধী অপরাধে নাছিম-আরাফাত-পরশসহ ৭ শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড সদ্য. ঢাবির এক হলের পাশে ককটেল বিস্ফোরণ সদ্য. ডিজিএফআইয়ের সাবেক ডিজি ও তার স্ত্রী-শ্যালকের কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের সন্ধান সদ্য. হুতি হামলায় বড় ধাক্কা, ইউরোপে তেল সরবরাহ স্থগিত করল সৌদি আরামকো সদ্য. নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো আজ সিলেট সফরে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি সদ্য. ‘টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কেন ভারতে যাইনি?’, ব্যাখ্যা দিলেন আসিফ নজরুল সদ্য. পুলিশের আট কর্মকর্তাকে বদলি ও পদায়ন সদ্য. কাদেরসহ ৫ জনের অর্ধেক সম্পত্তি যাবে জুলাইয়ের শহীদ পরিবারের কাছে সদ্য. প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি নয়, দুটি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে: নয়াদিল্লি সদ্য. গণতন্ত্র রক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব: রাষ্ট্রপতি সদ্য. মানবতাবিরোধী অপরাধে নাছিম-আরাফাত-পরশসহ ৭ শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড সদ্য. ঢাবির এক হলের পাশে ককটেল বিস্ফোরণ সদ্য. ডিজিএফআইয়ের সাবেক ডিজি ও তার স্ত্রী-শ্যালকের কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের সন্ধান সদ্য. হুতি হামলায় বড় ধাক্কা, ইউরোপে তেল সরবরাহ স্থগিত করল সৌদি আরামকো সদ্য. নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো আজ সিলেট সফরে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি সদ্য. ‘টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কেন ভারতে যাইনি?’, ব্যাখ্যা দিলেন আসিফ নজরুল সদ্য. পুলিশের আট কর্মকর্তাকে বদলি ও পদায়ন সদ্য. কাদেরসহ ৫ জনের অর্ধেক সম্পত্তি যাবে জুলাইয়ের শহীদ পরিবারের কাছে