কারওয়ান বাজার ও তেজগাঁও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিদেশে অবস্থানরত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের জন্য বিদেশ থেকে খুনিদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠানো হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তা রোববার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা জানান, বিদেশে থাকা এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। কারওয়ান বাজার ও তেজগাঁও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মুছাব্বিরের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব ছিল। হত্যাকাণ্ডের আগে কারওয়ান বাজার এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষও হয়। এ ঘটনায় মুছাব্বির একটি মামলা করেছিলেন। এ ছাড়া তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকটি রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক বিরোধ ছিল। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। এ জন্য বিদেশ থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন শুটার জিন্নাত (২৪), হত্যাকাণ্ডের মূল সমন্বয়কারী মো. বিল্লাল হোসেন, তাঁর চাচা আব্দুল কাদির এবং রিয়াজ (৩২)। দেশের বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে একটি নম্বরবিহীন মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে, যা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে দাবি ডিবির।
রোববার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে ডিবির প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, বিভিন্নভাবে তদন্ত করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
হত্যার উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে অপরাধজগতের কারও সংশ্লিষ্টতা আছে কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ভিকটিম একজন রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন। প্রাথমিকভাবে আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য জানতে তদন্ত চলবে।
আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় আছে কি না—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। বিল্লালের আরও এক ভাই এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। রহিম নামের ওই ব্যক্তি বর্তমানে পলাতক। ভিকটিম রাজনৈতিক নেতা হওয়ায় হত্যাকাণ্ডে রাজনৈতিক কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আসামিদের কারও কারও কারওয়ান বাজারে ব্যবসা রয়েছে এবং রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাঁদের ওঠাবসা ছিল।
হত্যাকাণ্ডের জন্য বিদেশ থেকে ১৫ লাখ টাকা পাঠানোর তথ্য সম্পর্কে শফিকুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়সহ একাধিক দিক তদন্তের আওতায় রয়েছে। তিনি জানান, কিছুদিন আগে মুছাব্বির চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে একটি মানববন্ধন করেছিলেন, যেখানে মারামারির ঘটনা ঘটে এবং সে বিষয়ে একটি মামলা হয়। পাশাপাশি তিনি একজন উদীয়মান ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন—এই বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
মুছাব্বির ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং একসময় কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন।
গত বুধবার রাত আটটার কিছু পরে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ের হোটেল সুপারস্টারের পাশে আহসানউল্লাহ টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের গলিতে বন্দুকধারীরা মুছাব্বিরকে গুলি করে। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা তেজগাঁও থানার ভ্যানশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান ব্যাপারী মাসুদও গুলিবিদ্ধ হন।
ঘটনার পরদিন মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় মামলা করেন। তিনি পুলিশকে জানান, বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁর স্বামী জীবননাশের হুমকি পেয়ে আসছিলেন।