হামের টিকার সুপ্রতিষ্ঠিত সরবরাহ ব্যবস্থা পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে দেশে টিকার সংকট তৈরি হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তার দাবি, আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের একাধিক সতর্কতা ও চিঠি উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার ‘মুক্ত দরপত্র’ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এই সংকট আরও তীব্র হয়।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় সংসদ অধিবেশনে এসব কথা বলেন তিনি।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান মোল্যা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৯ মাসের শাসনামলে স্বাস্থ্যখাতের কার্যকারিতা ও পরিচালনা নিয়ে সমালোচনা এবং বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেন।
জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিশাল অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও নীতিনির্ধারকদের এই সিদ্ধান্তহীনতা ও দায়িত্বহীনতার মাশুল শেষ পর্যন্ত দিতে হলো প্রাণ দিয়ে।’
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের বারবার দেওয়া সতর্কতা ও চিঠিপত্র সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে হামের টিকার সুপ্রতিষ্ঠিত সরবরাহ ব্যবস্থায় হঠাৎ পরিবর্তন আনে অন্তর্বর্তী সরকার। ‘মুক্ত দরপত্র’ চালুর এই ভুল নীতি এবং প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে দেশে তৈরি হয় টিকার তীব্র সংকট, যার সরাসরি বলি হতে হয়েছে অসংখ্য নিরপরাধ শিশুকে।’
সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে হামের টিকার তীব্র সংকট এবং তার প্রভাবে টিকাদান ব্যাহত হওয়ার পেছনের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী ভুলগুলো আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংস্থার বরাতে উঠে এসেছে।’
তিনি জানান, ‘বাংলাদেশ দীর্ঘ দিন ধরে জাতিসংঘের শিশু তহবিল বা ইউনিসেফ এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন বা গ্যাভির সহায়তায় আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত হামের টিকা সরাসরি সংগ্রহ করে আসছিল। তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দীর্ঘদিনের এই সুপ্রতিষ্ঠিত ও সফল পদ্ধতি হঠাৎ পরিবর্তন করে মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘তৎকালীন ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স অন্তর্বর্তী সরকারের এ সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে জানান, জরুরি জীবনরক্ষাকারী টিকার ক্ষেত্রে সাধারণ মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি একদমই উপযুক্ত নয় এবং এর ফলে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। এই বিষয়ে সতর্ক করে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ৫-৬টি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয় এবং প্রায় ১০টি জরুরি বৈঠকে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংকটের ব্যাপারে বারবার সতর্ক করা হলেও তৎকালীন নীতিনির্ধারকেরা তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেন।’
নতুন দরপত্র পদ্ধতি চালুর পর অর্থ ছাড় ও নথি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হয় বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘নতুন দরপত্র পদ্ধতি চালু করার পরপরই অর্থ ছাড় ও নথি অনুমোদন সংক্রান্ত নথিপত্র আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। এর ফলে আন্তর্জাতিক গুদামে টিকার পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও ঢাকা থেকে সময়মতো চূড়ান্ত সম্মতি ও তহবিল ছাড় না হওয়ায় টিকার চালান দেশে পৌঁছাতে মারাত্মক বিলম্ব ঘটে।’
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতার প্রভাবও শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিতে পড়েছিল বলে দাবি করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতার কারণে দেশের শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে সরকারের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পরিপূরক হাম-রুবেলা বা এমআর বিশেষ ক্যাম্পেইন আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাবে দেশজুড়ে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সঠিক সময়ে টিকার জোগান না থাকায় এবং বিশেষ ক্যাম্পেইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী বাংলাদেশের সাধারণ শিশু ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব অতি দ্রুত মারাত্মক ও প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করে।’
অধিবেশনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিগত দুটি অর্থবছরের মোট বাজেট বরাদ্দের পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন।
তিনি জানান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। স্বাস্থ্যখাতের সার্বিক উন্নয়ন এবং সারা দেশে স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যেই এই অর্থ বরাদ্দ করা হয়।
মন্ত্রী বলেন, জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যখাতের গুরুত্ব আরও বাড়ায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়িয়ে মোট ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা করা হয়। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বিপুল অর্থ পরিচালন ও উন্নয়ন এই দুই প্রধান খাতে ভাগ করে ব্যয় করা হয়েছে।
সদ্য সংবাদ/ এআর