সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। এরই অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির (বিওএফ) সম্প্রসারণ হিসেবে দেশের দ্বিতীয় অর্ডন্যান্স উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা জলিল টেক্সটাইল মিলের প্রায় ৫৫ একর জমি ও স্থাপনায় নতুন এই কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এখানে দেশের তিন বাহিনী ছাড়াও পুলিশ, আনসার-ভিডিপিসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা ও আধা-সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে ফৌজদারহাটে বিটিএমসির কাছ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে জমি ও স্থাপনা হস্তান্তরের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
সেনাপ্রধান বলেন, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধরে রাখতে শুধু বিদেশ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমদানির ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। দেশের প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জামের একটি বড় অংশ নিজেদের সক্ষমতায় উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ লক্ষ্যেই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, সীতাকুণ্ডের নতুন উৎপাদন কেন্দ্রের কার্যক্রম কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশীয় প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত উৎপাদিত সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির পরিকল্পনাও রয়েছে।
এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে একদিকে সমরাস্ত্র আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে নতুন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নতুন কারখানায় উৎপাদিত সামরিক সরঞ্জাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা ও আধা-সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনেও ব্যবহার করা হবে। এতে সংকটের সময়ে বিদেশি উৎস থেকে সরবরাহ পাওয়ার ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামের নিজস্ব সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
কারখানার জন্য ফৌজদারহাটের অবস্থানকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় কাঁচামাল আনা এবং ভবিষ্যতে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যোগাযোগ সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি সড়ক ও রেল যোগাযোগের সুবিধাও রয়েছে এলাকাটিতে।
প্রকল্পের জন্য দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা জলিল টেক্সটাইল মিলের প্রায় ৫৫ একর জমি ও স্থাপনা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত ১ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে প্রতীকী মূল্যে জমিটি সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
এরপর বৃহস্পতিবার জমি ও স্থাপনা হস্তান্তর সংক্রান্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়। চুক্তিতে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) পক্ষে চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম জাহিদ হাসান এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষে মিলিটারি এস্টেট অফিসার মিসেস সাজিয়ে তাহের স্বাক্ষর করেন।
অনুষ্ঠানে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, বস্ত্র ও পাট সচিব শরফ উদ্দিন আহমদসহ সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গাজীপুর সেনানিবাসে থাকা বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির পর সীতাকুণ্ডে দ্বিতীয় উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগকে দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের পরিধি বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদনব্যবস্থা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সমরাস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিধিবিধান ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিরক্ষা শিল্পকে ঘিরে প্রকৌশল, ধাতু, যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন সহযোগী শিল্পের বিকাশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি দক্ষ জনবল গড়ে ওঠার মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে দেশের সামরিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদন রপ্তানির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সীতাকুণ্ডের এই কেন্দ্র বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সদ্য সংবাদ/এসকে