ক্লাসরুম-শিক্ষক সংকটসহ নানা সমস্যায় কুবির রসায়ন বিভাগ, বাড়ছে সেশনজট

ক
কুবি প্রতিনিধি
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯:৪১:৪৮

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) রসায়ন বিভাগে শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাবরেটরির সংকটের পাশাপাশি রয়েছে পর্যাপ্ত জনবলের ঘাটতি। দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যা চলতে থাকায় ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা ও নির্ধারিত সময়ে স্নাতক শেষ করার ক্ষেত্রেও। ফলে সেশনজট নিয়ে উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে বিভাগটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

বিভাগীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে রসায়ন বিভাগে সাতটি ব্যাচের কার্যক্রম চলছে। এর বাইরে একটি ব্যাচের নয়জন শিক্ষার্থী থিসিস করছেন এবং একজন পিএইচডি শিক্ষার্থী রয়েছেন। সব মিলিয়ে বিভাগটির শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৩৩০ জন।

এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে বিভাগে শিক্ষক পদে রয়েছেন ১৬ জন। তবে তাঁদের মধ্যে সাতজন বর্তমানে শিক্ষা ছুটিতে থাকায় নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমে যুক্ত আছেন মাত্র নয়জন। ফলে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬ জন।

বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. শাহাদাৎ হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউজিসির মানদণ্ড বিবেচনায় ৩৩০ শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত ১৭ জন সক্রিয় শিক্ষক প্রয়োজন। আর বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যা আরও বেশি প্রায় ২৮ জন। অথচ বর্তমানে নিয়মিত পাঠদান করছেন নয়জন শিক্ষক।

শিক্ষক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতাও। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একটি ব্যাচের ক্লাস চলার সময় অন্য ব্যাচের শিক্ষার্থীদের অনেক সময় শ্রেণিকক্ষের বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। কখনো সায়েন্স ফ্যাকাল্টির সেমিনার কক্ষ কিংবা অন্য বিভাগের খালি কক্ষ ব্যবহার করে ক্লাস করতে হয়।

বিভাগের ব্যবহারিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে দুটি জেনারেল ও দুটি রিসার্চ ল্যাব রয়েছে। বিভাগীয় প্রধানের মতে, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও গবেষণামূলক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে অন্তত ছয়টি জেনারেল এবং চারটি রিসার্চ ল্যাব প্রয়োজন।

রসায়ন বিভাগের একজন শিক্ষার্থীকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মোট ২২টি ল্যাব কোর্স সম্পন্ন করতে হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত ল্যাব না থাকায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ব্যবহারিক ক্লাস পরিচালনায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এর পাশাপাশি মাত্র দুজন ল্যাব টেকনিশিয়ান দিয়ে বিভাগটির কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।

শুধু শিক্ষক ও ল্যাব নয়, প্রশাসনিক জনবলও প্রয়োজনের তুলনায় কম। বিভাগে বর্তমানে একজন কর্মকর্তা, একজন কম্পিউটার অপারেটর ও একজন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর রয়েছেন। বিভাগীয় প্রধানের ভাষ্য, ডাটা এন্ট্রি অপারেটরকে তাঁর নির্ধারিত কাজের পাশাপাশি অফিস সহায়কের দায়িত্বও পালন করতে হয়।

ল্যাব পরিচালনার অর্থসংকটও রয়েছে বলে জানিয়েছে বিভাগ। এক সেমিস্টারে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ব্যবহারিক কার্যক্রম চালাতে আনুমানিক ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা প্রয়োজন। বিপরীতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর ২০ শতাংশ ভ্যাট বাদ দেওয়ার পর হাতে থাকে প্রায় ২ লাখ টাকা।

এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মোট ৩ হাজার ৫০০ টাকা ল্যাব ফি, কেমিক্যালস সোসাইটির জন্য ২০০ টাকা এবং ইমপ্রুভমেন্ট পরীক্ষায় প্রতি কোর্সে ২০০ টাকা নেওয়া হয়। প্রশাসনের বরাদ্দ ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ মিলিয়েও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণের চাহিদা পূরণ কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছে বিভাগ।

সেশনজটের চিত্রও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সময়সূচিতে। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি। চার বছর মেয়াদি এই শিক্ষাবর্ষের স্নাতক কার্যক্রম ২০২৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও তা শেষ হয়নি। শিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্যমতে, এই ব্যাচের অনার্স শেষ হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

একই শিক্ষাবর্ষের অন্য বিভাগগুলোর শিক্ষার্থীদের অনার্স শেষ হয়ে গেলেও রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা এখনো একই পর্যায়ে আটকে থাকায় তাঁদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

অন্যদিকে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ক্লাস শুরু হয় ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ২০২৭ সালের ২৩ জানুয়ারির মধ্যে এই ব্যাচের স্নাতক শেষ হওয়ার কথা। তবে শিক্ষার্থীদের ধারণা, বাস্তবে তাদের একাডেমিক কার্যক্রম শেষ হতে আগামী বছরের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হসান বলেন, প্রতি সেমিস্টারে সাত থেকে আটটি কোর্স থাকায় নিয়মিত ক্লাস করতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। একটি ব্যাচের ক্লাস চলার সময় অন্য ব্যাচকে বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় সায়েন্স ফ্যাকাল্টির সেমিনার কক্ষ বা অন্য বিভাগের খালি কক্ষ খুঁজে ক্লাস করতে হয়।

ল্যাব সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিটি ব্যাচে একাধিক ল্যাব কোর্স থাকলেও বিভাগের মাত্র দুটি ল্যাব রয়েছে। শিক্ষক সংকটের কারণে ল্যাব ক্লাসেও পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন বলে জানান তিনি।

২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রিফাত হোসেন বলেন, শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতার কারণে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সেমিনার কক্ষ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ না থাকায় সেখানে পড়াশোনা বা একাডেমিক আলোচনা করতে সমস্যা হয়।

তবে তাঁর দাবি, আগের তুলনায় বিভাগের সেশনজট কিছুটা কমেছে।

বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, শিক্ষকস্বল্পতার কারণে শিক্ষকদের অতিরিক্ত কোর্স নিতে হচ্ছে। এতে তাঁদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে এবং একাডেমিক কার্যক্রমও প্রভাবিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী রসায়ন বিভাগে ২৬ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছেন ১৬ জন। তাঁদের মধ্যে সাতজন শিক্ষা ছুটিতে থাকায় সক্রিয় শিক্ষক রয়েছেন মাত্র নয়জন।

তাঁর মতে, ল্যাবনির্ভর বিভাগে পর্যাপ্ত ল্যাব, যন্ত্রপাতি ও টেকনিশিয়ান না থাকলে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন বাধাগ্রস্ত হয়। উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি ল্যাব ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সেশনজট প্রসঙ্গে বিভাগীয় প্রধান বলেন, আগের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ে শেষ করে সেশনজট শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তাঁর মেয়াদকালেই এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা অন্য কয়েকটি বিভাগের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের অনার্স অন্যান্য বিভাগের প্রায় শেষ হলেও রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের এখনো শেষ হয়নি।

তিনি জানান, এ বিষয়ে বিভাগীয় প্রধানকে ডেকে কথা বলা হয়েছে এবং দ্রুত সেশনজট কমিয়ে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম শেষ করার বিষয়ে তাঁকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।

শিক্ষক, ল্যাব, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিংবা ব্যবহারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হলে বিভাগকে প্রশাসনের কাছে আবেদন করার কথাও জানান উপ-উপাচার্য। যেসব সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা সম্ভব, সেগুলো দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রয়োজন হলে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

সদ্য সংবাদ/এসএস

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. হুমকি-ধমকিতে ভয় পাওয়ার দল না বিএনপি: মীর শাহে আলম সদ্য. ৪৯তম বিসিএসে ৬১১ জনকে শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগ সদ্য. সেপ্টেম্বরে ৭১ অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ উদ্ধার, কারা হেফাজতে মৃত্যু দ্বিগুণের বেশি: এমএসএফ সদ্য. মরিয়মের পরিবারের সঙ্গে এমপি নজরুলের আপস, আপত্তি নেই জামিনে সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর বাংলা উচ্চারণ নিয়ে শ্রেণিকক্ষে মন্তব্য করায় স্কুলশিক্ষক আটক সদ্য. সরকার নির্ধারিত দামে মিলছে না এলপিজি, ডিসিদের মাঠে নামার নির্দেশ সদ্য. ফার্নেস অয়েলের নতুন মূল্য নির্ধারণ, রাত ১২টা থেকে কার্যকর সদ্য. মিরপুরে সাংবাদিককে মারধরের করে ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ এসআই আল-আমিনের বিরুদ্ধে সদ্য. ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত সদ্য. নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলার ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন গ্রেপ্তার সদ্য. হুমকি-ধমকিতে ভয় পাওয়ার দল না বিএনপি: মীর শাহে আলম সদ্য. ৪৯তম বিসিএসে ৬১১ জনকে শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগ সদ্য. সেপ্টেম্বরে ৭১ অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ উদ্ধার, কারা হেফাজতে মৃত্যু দ্বিগুণের বেশি: এমএসএফ সদ্য. মরিয়মের পরিবারের সঙ্গে এমপি নজরুলের আপস, আপত্তি নেই জামিনে সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর বাংলা উচ্চারণ নিয়ে শ্রেণিকক্ষে মন্তব্য করায় স্কুলশিক্ষক আটক সদ্য. সরকার নির্ধারিত দামে মিলছে না এলপিজি, ডিসিদের মাঠে নামার নির্দেশ সদ্য. ফার্নেস অয়েলের নতুন মূল্য নির্ধারণ, রাত ১২টা থেকে কার্যকর সদ্য. মিরপুরে সাংবাদিককে মারধরের করে ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ এসআই আল-আমিনের বিরুদ্ধে সদ্য. ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত সদ্য. নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলার ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন গ্রেপ্তার