মাসের পর মাস ধরে মার্কিন গোয়েন্দারা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রতিটি পদক্ষেপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসছিল। শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই নজরদারির কাজে একটি ছোট দল সক্রিয় ছিল, যেখানে ভেনেজুয়েলা সরকারের ভেতরের একটি সূত্রও যুক্ত ছিল। মাদুরো কোথায় থাকেন, কী খান, কী পোশাক পরেন এবং প্রতিদিনের রুটিন কী—সবকিছুই নিখুঁতভাবে নথিভুক্ত করা হচ্ছিল।
এই দীর্ঘ প্রস্তুতির পর ডিসেম্বরের শুরুতে ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিসোলভ’ নামে অভিযানের চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। কয়েক মাস ধরে চলা পরিকল্পনা ও মহড়ার অংশ হিসেবে মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট ইউনিট কারাকাসে মাদুরোর প্রাসাদের সমান আকারের একটি প্রতিরূপ তৈরি করে সেখানে প্রবেশের বিভিন্ন পথ বারবার অনুশীলন করে। পরিকল্পনাটি ছিল অত্যন্ত গোপনীয় এবং কংগ্রেসকে এর বিস্তারিত জানানো হয়নি, এমনকি হামলার আগে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।
সব দিক পর্যালোচনার পর শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা অভিযানের উপযুক্ত মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিলেন। শনিবার তারা জানান, আচমকা আঘাত হেনে প্রতিপক্ষকে বিস্মিত করাই ছিল মূল লক্ষ্য। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে অভিযান শুরুর নির্দেশ আসে। জেনারেল কেইনের ভাষায়, ট্রাম্প তখন বলেছিলেন, ‘গুডলাক অ্যান্ড গডস্পিড’।
কারাকাসে তখন মধ্যরাত শুরু হওয়ায় মার্কিন বাহিনী রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিতে পারে। ভেনেজুয়েলার জল, স্থল ও আকাশসীমায় দুই ঘণ্টা ২৪ মিনিটের এই অভিযান তার ব্যাপ্তি ও নির্ভুলতার কারণে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। অভিযানের পরপরই কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তি এর নিন্দা জানায়। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডা সিলভা বলেন, ভেনেজুয়েলার নেতাকে সহিংসভাবে গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছে।
অভিযানের সময় ট্রাম্প ওয়াশিংটনের সিচুয়েশন রুমে ছিলেন না। তিনি ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো ক্লাবে বসে সিআইএ পরিচালক জন র্যাডক্লিফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে লাইভ স্ট্রিমে পুরো অভিযান পর্যবেক্ষণ করেন। পরে ট্রাম্প বলেন, ঘটনাটি দেখার অভিজ্ঞতা ছিল অবিশ্বাস্য, যেন একটি টেলিভিশন শো দেখছেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওই অঞ্চলে হাজার হাজার মার্কিন সেনা, একটি বিমানবাহী রণতরী ও বহু যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক প্রস্তুতি নেয়। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, মাদুরো সরকার যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও অপরাধচক্রের সদস্য পাঠাচ্ছে। এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মাদক পরিবহনের সন্দেহে একাধিক ছোট নৌকায় হামলাও চালানো হয়েছে।
যদিও প্রাথমিক পরিকল্পনায় আকাশপথে অভিযানের কথা ছিল। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, অভিযানে দেড়শোর বেশি বিমান ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে বোমারু, ফাইটার জেট ও নজরদারি বিমান ছিল। রাত দুইটার দিকে কারাকাসে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং শহরের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণের শব্দে জানালা কেঁপে ওঠে এবং শহরজুড়ে বিমান ও হেলিকপ্টারের তীব্র শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিস্ফোরণ ও আকাশে নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া হেলিকপ্টারের ভিডিও।
বিস্ফোরণস্থল শনাক্ত করতে যাচাই করে দেখা গেছে, কারাকাসের কাছাকাছি অন্তত পাঁচটি স্থাপনায় হামলা হয়েছে, যার মধ্যে একটি বিমানঘাঁটি, একটি এয়ারফিল্ড এবং বন্দর রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, অভিযানের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য সামরিক স্থাপনাও ছিল। অভিযানের সময় কারাকাসের বেশিরভাগ এলাকা অন্ধকারে রাখা হয়।
হামলার পর মার্কিন বাহিনী শহরের ভেতরে প্রবেশ করে। তাদের সঙ্গে ছিল এলিট ডেলটা ফোর্স, যারা সর্বাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ছিল। জেনারেল কেইনের মতে, স্থানীয় সময় রাত দুইটা এক মিনিটের মধ্যেই তারা মাদুরোর অবস্থানে পৌঁছে যায়। ট্রাম্প মাদুরোর নিরাপদ আশ্রয়স্থলকে নিশ্ছিদ্র সামরিক দুর্গ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, ভেনেজুয়েলার বাহিনী আগে থেকেই হামলার আভাস পেয়েছিল।
সংঘর্ষের সময় ভেনেজুয়েলার সেনাদের সঙ্গে লড়াই হয় এবং একটি মার্কিন হেলিকপ্টারও আক্রমণের শিকার হয়, যদিও সেটি উড্ডয়নে সক্ষম ছিল। অভিযানের মধ্যেই মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও আটক করা হয়। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসের সদস্যদের বিষয়টি জানাতে শুরু করেন, যা নিয়ে কিছু আইনপ্রণেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সিনেটে ডেমোক্র্যাট দলের নেতা চাক শুমার বলেন, মাদুরো একজন অবৈধ স্বৈরশাসক হলেও কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এমন সামরিক পদক্ষেপ বেপরোয়া। অন্যদিকে রুবিও জানান, আগে থেকে কংগ্রেসকে জানালে মিশন ঝুঁকিতে পড়তে পারত।
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, অভিযানের সময় মাদুরো একটি নিরাপদ কক্ষে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেটিও নিরাপদ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযানে কয়েকজন আহত হলেও কোনো মার্কিন সেনা নিহত হননি। ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষ হতাহতের বিষয়ে কিছু নিশ্চিত করেনি।
এর আগে মাদুরোকে গ্রেপ্তারের তথ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ৫০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। শনিবার ভোর চারটা ২০ মিনিটের দিকে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে বহনকারী একটি হেলিকপ্টার ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা ত্যাগ করে নিউ ইয়র্কের দিকে রওনা দেয়। প্রায় এক ঘণ্টা পর ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেন এবং জানান, তারা শিগগিরই মার্কিন বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি হবেন।