ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে আনার পর লাতিন আমেরিকার আরও তিন দেশ—কিউবা, মেক্সিকো ও কলম্বিয়াকে সতর্কবার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর অভিযোগ, এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে মাদক চোরাচালানে সরকারের পর্যায়ের সহযোগিতা করছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করছে।
একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগ্রহও আবার প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের মতে, এসব বক্তব্য ও পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক রীতিনীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং বিশ্বব্যবস্থায় ‘আইনের কার্যকারিতা’ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই খনিজ সম্পদ আহরণে জোর দেওয়ার কথা বলে আসছেন ট্রাম্প। মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে এই কৌশল গ্রহণের ইঙ্গিতও দেন তিনি। বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও এর বড় অংশ এখনো অব্যবহৃত।
মাদুরোকে অপহরণের ঘটনার পর গত রোববার আবারও গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিক-এ প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন—এটা আমাদের নিরাপত্তার স্বার্থেই।’ তাঁর দাবি, অঞ্চলটি রাশিয়া ও চীনের জাহাজ দ্বারা ঘিরে রাখা হচ্ছে।
এ সাক্ষাৎকারের পরপরই হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলার গ্রিনল্যান্ডের একটি ছবি প্রকাশ করেন, যেখানে পুরো দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা দেখা যায়। ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘খুব শিগগির’।
এতে ডেনমার্কসহ ইউরোপের দেশগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে। ডেনমার্কে যুক্তরাষ্ট্রের দূত জেসপার মোলার সোয়েরেনসেন বলেন, ডেনমার্কের আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রত্যাশা করে তাঁর দেশ। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স–ফ্রেডেরিক নিলসেন ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারসহ ইউরোপের বিভিন্ন নেতাও সমালোচনা করেন।
গত শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে নেওয়ার পর থেকেই লাতিন আমেরিকাজুড়ে বিক্ষোভ চলছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা হলেও ট্রাম্প জানিয়েছেন, ‘সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা বদল’ না হওয়া পর্যন্ত ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত সরকার থাকবে।
এর ধারাবাহিকতায় কলম্বিয়া, কিউবা ও মেক্সিকোর প্রতিও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, কলম্বিয়ায় ‘একজন অসুস্থ মানুষ’ প্রশাসন চালাচ্ছেন এবং কোকেন উৎপাদন করে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করছেন। কলম্বিয়ায় সামরিক অভিযান চালানো হবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা আমার জন্য ভালো একটি রাস্তা।’
কলম্বিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বক্তব্যকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করে। দেশটির প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এক্সে লিখেছেন, তিনি অস্ত্র না ধরার শপথ নিয়েছিলেন, তবে প্রয়োজনে দেশের জন্য আবার অস্ত্র তুলবেন।
রোববার কিউবার সরকার পতনের ইঙ্গিতও দেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ভেনেজুয়েলার তেলনির্ভর কিউবার অর্থনীতি ধসে পড়বে এবং তাতে কমিউনিস্ট সরকারের পতন ঘটবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও মাদক দমনের অজুহাতে কিউবায় সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত দেন তিনি।
মেক্সিকো প্রসঙ্গেও ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবেশের অন্যতম পথ দেশটি। পরিস্থিতি না বদলালে সেখানে সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে। তিনি মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেনবাউমকে ‘ভয়ংকর নারী’ বলেও মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের এসব বক্তব্য ও পদক্ষেপকে আধিপত্যবাদী আচরণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। দ্য গার্ডিয়ান-এর কলাম লেখক নেসরিন মালিক বলেন, ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের এই অভ্যুত্থান শুধু নিয়ম ভাঙেনি, বরং দেখিয়ে দিয়েছে—এ ক্ষেত্রে কোনো নিয়মই আর মানা হচ্ছে না।