ইরান বিক্ষোভ: কীভাবে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের পথ খুলে গেল

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:২৭

তেহরানে প্রথম বিক্ষোভ শুরুর পর কেটে গেছে ১৮ দিন। অর্থনৈতিক সংকটের জেরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে ইরানিদের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াই ছিল এর সূচনা।

শিগগিরই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য শহরে। আর অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া দিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন রূপ নেয় শাসনব্যবস্থার পতনের আহ্বানে।

অস্থিরতার পাশাপাশি তীব্র হয়েছে তথ্যযুদ্ধও। সরকার এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রসমর্থিত রাজতন্ত্রপন্থী পারস্যভাষী কিছু মাধ্যম—উভয় পক্ষই ভুয়া ও ভুল সংবাদ ছড়াচ্ছে, এমনকি এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও প্রচার করছে।

৮ জানুয়ারি শুরু হওয়া দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দুই পক্ষের ভিডিও ও প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবু মিডল ইস্ট আই বিক্ষোভ এবং বিশেষ করে ব্ল্যাকআউটের পরের প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের যতটা সম্ভব নির্ভুল বিবরণ তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

এই প্রতিবেদনে ইরানের ভেতরে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী, সম্প্রতি দেশত্যাগ করা এক ইরানি নাগরিক, নির্বাসিত পারস্যভাষী গণমাধ্যমের ওপেন-সোর্স বিশ্লেষক এবং মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার ব্যবহার করা হয়েছে।

ব্ল্যাকআউটের শুরু

৮ জানুয়ারি ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার পর অনেক ইরানির আশঙ্কা ছিল—আগের বিক্ষোভগুলোর মতোই এবারও ইন্টারনেট বন্ধ হলেই সেনাবাহিনী নামবে এবং হত্যাযজ্ঞ শুরু হবে। ২০১৭, ২০১৯ ও ২০২২ সালে এই ধারা দেখা গিয়েছিল।

৮ জানুয়ারি রাজধানীর তেহরানপার্স এলাকায় এক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া একটি সূত্র মিডল ইস্ট আইকে জানান, শুরুতে “অদ্ভুতভাবে, দাঙ্গা পুলিশ বা অন্যান্য বাহিনীর তেমন উপস্থিতি ছিল না।”

কিন্তু ভিড় জমে শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্লোগান শুরু হতেই হঠাৎ গুলিবর্ষণ শুরু হয় এবং তা মধ্যরাত পর্যন্ত চলে।

পরদিন, সাপ্তাহিক ছুটি শুরু হলে সন্ধ্যা নামতেই আবার সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে; বিক্ষোভকারীরা ফের রাস্তায় নামেন।

তেহরানের আরেকটি সূত্র মিডল ইস্ট আইকে জানান, তিনি ঘরের ভেতর থাকলেও মধ্যরাতের অনেক পর পর্যন্ত গুলির শব্দ শুনেছেন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সরাসরি গুলি ব্যবহার শাসনব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয় ২৮ ডিসেম্বর। শুরুতে তেহরান, ইসফাহান ও মাশহাদসহ বড় শহরগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনী শটগান প্যালেট দিয়ে ভিড় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিল।

তখন পর্যন্ত মূলত ছোট শহরগুলোতেই সরাসরি গুলি ব্যবহার করা হতো, যেখানে বিক্ষোভকারীরা সরকারি ভবনে হামলা চালিয়েছিলেন।

নরওয়ে-ভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস (IHRNGO)-এর পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম জানান, ইন্টারনেট বন্ধের পর কিছু বিক্ষোভকারী প্রথমে প্যালেটে আহত হন, পরে সরাসরি গুলিতে নিহত হন।

বিক্ষোভকারী ও দমনকারী বাহিনী

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ও মিডল ইস্ট আই যাচাইকৃত ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, বিক্ষোভে সমাজের সব স্তরের ইরানিরাই অংশ নিচ্ছেন।

ভিড়ে তরুণদের সংখ্যাই বেশি, তবে বয়স্ক মানুষ ও শিশুরাও রয়েছে। IHRNGO জানায়, নিহতদের অধিকাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রথমে পুলিশ মোতায়েন করা হয়, পরে বিপুল সংখ্যক দাঙ্গা পুলিশ এবং তুলনামূলক কমসংখ্যক বাসিজ বাহিনী নামানো হয়।

অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়লে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর শাখা বাসিজকে ডাকা হয়।

বাসিজ সদস্যরা প্রায়ই সাদাপোশাকে থাকেন, সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং আগে লেবানন ও সিরিয়ায় মোতায়েন হয়েছেন।

তেহরানে IRGC-এর বিশেষ ইউনিটও নামানো হয়েছে। অধিকাংশ সরাসরি গুলিবর্ষণ এসেছে এসব বাহিনী থেকেই।

IRGC-এর একাধিক সামরিক ও গোয়েন্দা শাখা রয়েছে; বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভ দমনের জন্য নির্দিষ্ট ইউনিটও আছে।

তেহরানে এ দায়িত্ব পালন করে মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কর্পস।

সাম্প্রতিক দিনের ছবি ও ভিডিওতে বিক্ষোভকারীদের হত্যায় IRGC বাহিনীর ব্যাপক সম্পৃক্ততা দেখা যায়।

কতজন নিহত, আহত ও গ্রেপ্তার?

সাম্প্রতিক বিক্ষোভে মোট নিহতের সংখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়।

মঙ্গলবার IHRNGO জানায়, অন্তত ৭৩৪ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১২ শিশু; হাজারো মানুষ আহত এবং ১০ হাজারের বেশি গ্রেপ্তার হয়েছেন।

আমিরি-মোগাদ্দাম মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় কেবল যাচাই করা তথ্যই তাদের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে; প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, অনেক হাসপাতালের মর্গে লাশের স্তূপ জমেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, প্রায় ২,০০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।

৮ জানুয়ারি তেহরানে নিহত ২৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী রুবিনা আমিনিয়ানের এক আত্মীয় বলেন, রুবিনার মরদেহ শনাক্ত করতে গিয়ে তার বাবা-মা শত শত লাশের মুখোমুখি হন। অধিকাংশের বয়স ১৮ থেকে ২২ বছর এবং খুব কাছ থেকে গলায় গুলি করা হয়েছিল।

তেহরানের কাছে কাহরিজাকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেন্দ্র থেকে পাওয়া এক ভিডিওতে মৃতদের রক্তমাখা মুখ বা গুলির চিহ্ন দেখা যায়। ভিডিওতে কালো ব্যাগে ভরা রাস্তায় পড়ে থাকা ডজন ডজন লাশও দেখা যায়।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও বিপুল মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, যদিও তারা নিহতদের ‘সন্ত্রাসী হামলার শিকার’ বলে বর্ণনা করছে।

দেশের প্রধান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (IRIB) সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে একটি প্রতিবেদন শেয়ার করেছে, যেখানে তেহরানের ফরেনসিক কেন্দ্রে কালো ব্যাগে সারি সারি লাশ দেখা যায়।

এরপর কী হতে পারে?

বিক্ষোভ মোকাবিলায় শাসনব্যবস্থার সরকারি বয়ান হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে দাঙ্গায় রূপ দিয়েছে।

এই যুক্তির পক্ষে কর্মকর্তারা অস্থিরতাকে জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখাচ্ছেন; ওই সময়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইরানে হামলা চালিয়ে প্রায় ১,০০০ মানুষকে হত্যা করেছিল।

এই বয়ান জোরদার করতে সরকার বারবার ২ জানুয়ারি সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর এক্সে দেওয়া পোস্টের কথা উল্লেখ করছে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন: “রাস্তায় থাকা প্রতিটি ইরানিকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। তাদের পাশে হাঁটা প্রতিটি মোসাদ এজেন্টকেও…”

১১ জানুয়ারি সরকার অস্থিরতায় নিহত ‘শহীদদের’—যেমন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের—স্মরণে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে।

পরদিন, শাসনব্যবস্থার সমর্থনে কয়েকটি শহরে অনুগত গোষ্ঠীগুলোকে রাস্তায় নামানো হয়।

অতীতের অস্থিরতার সময়েও সরকার এ কৌশল নিয়েছে, যদিও এসব সমাবেশ সবসময় বিক্ষোভকারীদের ঘরে ফেরাতে পারেনি।

উদাহরণ হিসেবে, ২০০৯ সালে নির্বাচনী ফল চ্যালেঞ্জ করে তেহরানে শুরু হওয়া বিক্ষোভ কয়েকটি সরকারপন্থী মিছিলের পরও আট মাস ধরে চলেছিল।

সাম্প্রতিক দমন-পীড়ন বিক্ষোভকারীদের ওপর কী প্রভাব ফেলেছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে নিহতদের ভিডিও ব্যাপকভাবে দেখানো থেকে বোঝা যায়—মানসিক চাপ সৃষ্টি করে মানুষকে রাস্তায় নামা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা চলছে।

ইরানি গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ নাজলি কামৌরি এক্সে লেখেন: “ইসলামিক রিপাবলিকের গণমাধ্যম ইচ্ছাকৃতভাবে বিক্ষোভে নিহতদের লাশ দেখাচ্ছে; এটি তথ্য ফাঁসের ফল নয়, বরং একটি বার্তা। ক্ষমতার সব শাখা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিচ্ছে: আমরা হত্যা করব, আমরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করব।”

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এতে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আটক ব্যক্তিদের দ্রুত বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কা গুরুতরভাবে বেড়েছে।

ইরান অতীতের অস্থিরতায়—২০২২ সালে এবং জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়—এই কৌশল ব্যবহার করেছে।

বুধবার বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেই বিক্ষোভকারীদের আটক রাখা এক কারাগার পরিদর্শনকালে বলেন, শিগগিরই প্রকাশ্য দ্রুত বিচার শুরু হবে।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. একাদশে ভর্তি: প্রথম ধাপের ফল প্রকাশ সদ্য. ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ মৃত্যু, হাসপাতালে ১,৭৫৩ সদ্য. অক্টোবরেই রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ: রুশ রাষ্ট্রদূত সদ্য. একনেকে আড়াই লাখ কোটি টাকার তিন মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন সদ্য. হাসিনাকে ফেরত না দিয়ে ভারত চক্রান্ত করছে: রিজভী সদ্য. পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে জিয়াউর রহমানের লেখা সদ্য. আওয়ামী লীগের মিছিল: ওসির পর এবার গুলশান জোনের ডিসি প্রত্যাহার সদ্য. আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভারত-পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজের মাঝে সংঘর্ষ সদ্য. ৮ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর গোবিপ্রবি ভিসিকে উদ্ধার, পরদিন সহকারী প্রক্টরের পদত্যাগ সদ্য. হুথিদের ঠেকাতে যুক্তরাজ্যের সামরিক সহায়তা চাইল সৌদি সদ্য. একাদশে ভর্তি: প্রথম ধাপের ফল প্রকাশ সদ্য. ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ মৃত্যু, হাসপাতালে ১,৭৫৩ সদ্য. অক্টোবরেই রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ: রুশ রাষ্ট্রদূত সদ্য. একনেকে আড়াই লাখ কোটি টাকার তিন মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন সদ্য. হাসিনাকে ফেরত না দিয়ে ভারত চক্রান্ত করছে: রিজভী সদ্য. পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে জিয়াউর রহমানের লেখা সদ্য. আওয়ামী লীগের মিছিল: ওসির পর এবার গুলশান জোনের ডিসি প্রত্যাহার সদ্য. আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভারত-পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজের মাঝে সংঘর্ষ সদ্য. ৮ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর গোবিপ্রবি ভিসিকে উদ্ধার, পরদিন সহকারী প্রক্টরের পদত্যাগ সদ্য. হুথিদের ঠেকাতে যুক্তরাজ্যের সামরিক সহায়তা চাইল সৌদি