দেশের সর্বপ্রথম বিআরটি প্রকল্প, যা একসময় রাজধানী ও গাজীপুরের পরিবহনব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা করার কথা ছিল, দীর্ঘ এক যুগ পর এসে আজ পরিণত হয়েছে এক পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপে।
অজস্র অর্থ ব্যয়, অসংখ্য প্রতিশ্রুতি এবং লাগাতার দুর্নীতির অভিযোগের পর শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়াই যেন সহজ সমাধান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বাজেট ফুলে-ফেঁপে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায়। তবুও সংশ্লিষ্টদের দাবি, ৯৭ শতাংশ কাজ নাকি শেষ হয়েছে।
এই পর্যায়ে বাকি ৩ শতাংশ কাজ শেষ করতে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের আবেদন করা হয়। তবে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের কারণে সেই আবেদন বাতিল করা হয় এবং গ্রহণ করা হয় প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্ত।
এতে জনমনে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে প্রশ্ন—এটা কি উন্নয়ন, নাকি পরিকল্পিত অর্থসাফাই? ৪ হাজার কোটিরও বেশি টাকা গেল কোথায়? এই প্রহসনের দায় নেবে কে?
এদিকে প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলেও গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্মিত সড়ক ও সেতুগুলো এখন যেন উন্মুক্ত দখলবাজারে পরিণত হয়েছে। যে যেভাবে পারছে, সরঞ্জাম খুলে নিয়ে যাচ্ছে, জায়গা দখল করছে, মালামাল লুট করছে। দেখভালের দায়িত্বে নেই কোনো সংস্থা, রাষ্ট্রের উপস্থিতিও কার্যত অনুপস্থিত।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি টঙ্গী কলেজ গেট এলাকায়। উড়ালসেতুর জয়েন্টের ভারী লোহার সরঞ্জাম পর্যন্ত খুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। শুধু একটি স্থান নয়, পুরো প্রকল্পজুড়ে যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, লাইট, সিগন্যালসহ অসংখ্য মূল্যবান সম্পদ কোটি কোটি টাকার লুট হয়ে গেছে। সবই এখন অদৃশ্য শক্তির কবলে, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
গাড়িচালকদের ক্ষোভ যেন বিস্ফোরণের মুখে। উড়ালসেতুর জয়েন্টের সরঞ্জাম না থাকায় গাড়ি থামাতে হয়। আর থামলেই পেছন থেকে আরেকটি গাড়ি এসে ধাক্কা দেয়। চালকদের প্রশ্ন, “আমাদের জীবনের ঝুঁকি কার কাছে বলব? এর জবাব কে দেবে?”
সাধারণ মানুষের প্রশ্নও একই সুরে ধ্বনিত হচ্ছে—এত টাকা খরচ করে প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত কেন বন্ধ হলো? কেন এই অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দায়হীনতা? দেশবাসী কি কখনও এর সত্যিকারের জবাব পাবে?