ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রকাশিত বিভিন্ন জরিপে বিএনপির সমর্থন জামায়াতের তুলনায় এগিয়ে থাকলেও ব্যবধানের মাত্রা নিয়ে স্পষ্ট ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। ন্যারেটিভ/আইআইএলডির জরিপে দুই দলের ব্যবধান মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ, বিপরীতে ইনোভিশনের সর্বশেষ প্যানেল স্টাডিতে বিএনপি ২১ দশমিক ৮ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে।
এই পার্থক্যকে এলোমেলো বলা যায় না; এটি মূলত জরিপ পদ্ধতির ভিন্নতার ফল। ন্যারেটিভ কনসোর্টিয়ামের জরিপটি ২৯৫টি আসনের ২২ হাজার ১৭৪ জন উত্তরদাতার ওপর পরিচালিত হয়, যা নির্দিষ্ট সময়ের জনমতের একটি স্থির চিত্র তুলে ধরে। অন্যদিকে ইনোভিশন পূর্বে সাক্ষাৎকার নেওয়া ৫ হাজার ১৪৭ জন ভোটারের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করেছে, ফলে সময়ের সঙ্গে জনমতের প্রকৃত পরিবর্তন ধরতে এ জরিপকে তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরযোগ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের ওপর। ঐতিহ্যগতভাবে দলটি মোট ভোটের ৩৫ থেকে ৪৮ শতাংশ পেয়ে এসেছে। তবে বর্তমান নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রায় ৪ কোটি ভোটার নতুন রাজনৈতিক ঠিকানা খুঁজছেন। সিআরএফ/বিপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকছে। একই সঙ্গে এই ভোটব্যাংকের দ্বিতীয় বড় সুবিধাভোগী হিসেবে উঠে আসছে জামায়াত।
বাংলাদেশের ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট পদ্ধতিও ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ৩০০টি একক নির্বাচনী এলাকায় যে প্রার্থী সর্বাধিক ভোট পাবেন, তিনিই বিজয়ী হবেন। ফলে কেন্দ্রীভিত্তিক শক্ত সমর্থন থাকলে তুলনামূলক কম ভোট পেয়েও বেশি আসন জেতা সম্ভব। ন্যারেটিভ জরিপের ইঙ্গিত অনুযায়ী, সামান্য ভোটে পিছিয়েও জামায়াত আসনসংখ্যায় উল্লেখযোগ্য লাভ করতে পারে।
নির্বাচনের ফল নির্ধারণে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ৯২ জন নেতা স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন, যা ১৫ থেকে ৩০টি আসনে দলের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তরুণ ভোটারদের মধ্যেও একটি স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে; প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ভোটারদের ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ জামায়াতের প্রতি ঝুঁকছেন, ফলে ভোটার উপস্থিতি বেশি হলে দলটির আসন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি জরিপে ১৫ থেকে ৩৫ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন, যাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই ফলাফলের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
আসন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ৩০০ আসনের সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৫১ আসন। হিসাব বলছে, বিএনপি ও তার জোট পেতে পারে ১৫৫ থেকে ২১৫টি আসন, জামায়াত ও এনসিপি ৫৫ থেকে ১১০টি, জাতীয় পার্টি ৫ থেকে ১৮টি, ইসলামী আন্দোলন ২ থেকে ১০টি এবং অন্যান্য বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১০ থেকে ৩৫টি আসন পেতে পারেন। সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্রে বিএনপি ও জোটের ঝুলিতে ১৮৫টি, জামায়াত ও এনসিপির ৮০টি, জাতীয় পার্টির ১০টি, ইসলামী আন্দোলনের ৫টি এবং অন্যান্য বা স্বতন্ত্রদের ২০টি আসন যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
সম্ভাব্য ফলাফলের মধ্যে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় অর্ধেক, যেখানে তাদের আসনসংখ্যা ১৮৫ থেকে ২১৫ হতে পারে। ১৫৫ থেকে ১৮৫ আসন পেয়ে তুলনামূলক কম ব্যবধানে জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। ঝুলন্ত সংসদের সম্ভাবনাও সমানভাবে ২০ শতাংশ, আর জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের জয়ের সম্ভাবনা ধরা হচ্ছে ১০ শতাংশ, যেখানে বিএনপি ১৩০-এর নিচে এবং জামায়াত ১৩০-এর বেশি আসন পেতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি বিজয়ী কে হবে, তা নয়; বরং ব্যবধান কতটা বড় হবে সেটিই মুখ্য। দোদুল্যমান ভোটারদের সিদ্ধান্ত, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং জামায়াতপন্থী তরুণ ভোটারদের উপস্থিতিই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে। ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ১২ দশমিক ৮ কোটি ভোটার যে রায় দেবেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, আপাতত ভোটের ভার বিএনপির দিকেই, তবে অনিশ্চয়তার জায়গা এখনো রয়ে গেছে।