তখনও দুপুরের ভাত চুলায়। রান্না শেষ না হওয়ায় মা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলে প্লাস্টিকের বস্তা নিয়ে প্রতিবেশীর বাসায় পাঠিয়েছিলেন মেয়েকে। কিন্তু গরম ভাত নিয়ে ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা মা আর খুঁজে পাননি তাঁর শিশু কন্যাকে। পরদিন সকালে পাশের একটি বাড়ির দরজার সামনে মেলে ১৩ বছর বয়সী সেই শিশুর মরদেহ।পেশায় গৃহকর্মী নাসিমার পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া কন্যা মোছা. আলিফা শনিবার বিকেল আনুমানিক চারটার দিকে বাড়ির সামনে থেকে নিখোঁজ হয়। পরদিন রোববার সকালে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। পাশেই পড়ে ছিল প্লাস্টিকের বস্তাটি।
আলিফা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বন্দর থানাধীন ২০ নম্বর ওয়ার্ডের দড়ি সোনাকান্দা এলাকার বাসিন্দা মো. আলী ও নাসিমা দম্পতির বড় কন্যা। তাঁদের গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার ধলাগাঁও গ্রামে। প্রায় ১০ বছর ধরে তাঁরা দড়ি সোনাকান্দা এলাকায় ভাড়াবাসায় বসবাস করছেন। এই দম্পতির আরও একটি ৮ বছর বয়সী কন্যা রয়েছে।
আলিফার বাবা ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক মো. আলী বলেন, বিকেলে গাড়ি গ্যারেজে রেখে বাসায় ফিরে তিনি জানতে পারেন তাঁর সন্তান নিখোঁজ। রাত সাড়ে তিনটা পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করেও সন্তানের সন্ধান পাননি। স্থানীয় দুটি মসজিদে মাইকিংও করা হয়।
বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মুক্তার আশরাফ বলেন, স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সকালে মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়।
তিনি বলেন, “শিশুটির পরিবার যে ভাড়াবাড়িতে থাকে, তার পেছনের আরেকটি বাসার দরজার সামনে মরদেহটি পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে মুখমণ্ডলের আঘাত ও অন্যান্য আলামত দেখে ধারণা করা হচ্ছে, মৃত্যুর আগে শিশুটি যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।”
ময়নাতদন্ত শেষে বিকেলে মুঠোফোনে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. জহিরুল ইসলাম জানান, “শিশুটির গালে ও গলায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা মানুষের নখের মতো বলে ধারণা করছি। এছাড়া ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিল কি না, তা জানতে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে বিস্তারিত জানা যাবে।”
সরেজমিনে দড়ি সোনাকান্দা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবেশীরাও আলিফার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত। তাঁরা হত্যাকারীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
যে বাড়ির দরজার সামনে আলিফার মরদেহ পাওয়া যায়, সেটির মালিক আক্তার হোসেন। তাঁর ভাই ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক ইস্রাফিল ইসলাম বলেন, আক্তার হোসেন ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার সময় মরদেহটি দেখেননি। নামাজ শেষে ফিরে এসে ঘরের সামনে শিশুটির মরদেহ দেখতে পান।
তিনি বলেন, “আমার ভাই তখন ডাকচিৎকার দিলে আমরা সবাই বেরিয়ে আসি। পরে শিশুটির পরিবারকে খবর দেওয়া হয়। তারা এসে শনাক্ত করে যে লাশটি আলিফার।”
এ ঘটনায় আক্তার হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় অন্তত ১০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দড়ি সোনাকান্দা এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের অবাধ বিচরণ রয়েছে। অনেকের ধারণা, মাদকসেবীদের কেউ এই ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর শিউলী নওশাদ বলেন, “এখানে মাদকের ছড়াছড়ি। স্থানীয় পঞ্চায়েত নিয়ে একাধিকবার বসেছি, কিন্তু কেউ শোনে না। উল্টো হুমকি দেয়। আমরা সন্দেহ করছি, মাদকসেবীদের কেউ এই ভয়ংকর কাজটি করেছে। শিশু কন্যার সঙ্গে এমন নির্মমতা স্বাভাবিক মানুষ করতে পারে না।”
তবে এলাকাটি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাভুক্ত না থাকায় ঘাতকদের শনাক্ত করতে বেগ পেতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
চলতি মাসে পঞ্চম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা দিয়েছিল আলিফা। আগামী ৩০ ডিসেম্বর ফল প্রকাশের কথা। ভালো ফলের অপেক্ষায় থাকা শিশুটির এমন মর্মান্তিক মৃত্যু শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও গভীরভাবে ব্যথিত করেছে বলে জানান তার প্রাইভেট টিউটর সুলতানা রাজিয়া।
এ ঘটনায় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানান বন্দর থানার ওসি গোলাম মুক্তার আশরাফ।