যুদ্ধ, অবরোধ আর তীব্র পণ্যসংকটে গাজা উপত্যকার মানুষের জীবনযাত্রা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। একসময় যে লাইটার মাত্র ১০ টাকায় পাওয়া যেত, সেটিই এখন কিনতে হচ্ছে প্রায় ৫ হাজার টাকায়। আর ব্যবহৃত ও ভাঙাচোরা একটি ফ্যানের দাম উঠেছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। চড়া দাম দিয়েও অনেক সময় মিলছে না প্রয়োজনীয় এসব পণ্য।
গাজায় যুদ্ধের আগে স্থানীয় মুদ্রা এক শেকেলে প্রায় ৩৭ টাকা দিয়ে তিন থেকে চারটি সাধারণ লাইটার পাওয়া যেত। কিন্তু এখন একটি লাইটারের দাম গিয়ে ঠেকেছে প্রায় ১২০ শেকেলে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার টাকার কাছাকাছি। ফলে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে আগুন জ্বালানোর এই অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
লাইটারের অস্বাভাবিক দাম বাড়ায় গাজায় শুরু হয়েছে নষ্ট লাইটার মেরামতের কাজও। ঘরবাড়ি হারানো হাসনা আবু এখন পুরোনো ও নষ্ট লাইটার মেরামত করে জীবিকা চালানোর চেষ্টা করছেন। তার ভাষ্য, বাইরের মানুষের কাছে লাইটার হয়তো খুব ছোট একটি জিনিস। কিন্তু গাজায় এটি এখন খাবার, পানি কিংবা আটার মতোই প্রয়োজনীয়।
কারণ, রান্নার জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস বা জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সামান্য খাবার রান্না করতেও আগুন জ্বালানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আবির শিহাব নামের এক নারী জানান, সামান্য রুটি বা খাবার তৈরির জন্য কখনো কার্ড কিংবা কাগজ পুড়িয়ে আগুন জ্বালাতে হচ্ছে। একটি লাইটার পাওয়া এখন অনেকটা সোনার হরিণ পাওয়ার মতো। লাইটার না থাকলে চুলা জ্বলে না, আর চুলা না জ্বললে পরিবারের দিনের খাবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
তবে শুধু লাইটার নয়, গাজার মানুষের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র গরম। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপে ছোট ছোট তাঁবুগুলো ভেতর থেকে যেন চুল্লিতে পরিণত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি বৈদ্যুতিক ফ্যান হয়ে উঠেছে জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ সহায়।
কিন্তু সেই ফ্যানের দামও এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। পুরোনো ও ভাঙাচোরা একটি ফ্যানের দাম প্রায় ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। এরপরও বাজারে চাহিদার তুলনায় ফ্যানের সরবরাহ খুবই কম।
মোহাম্মদ আবু এল এনায়েন নামের এক বাবা তাঁবুর ভেতরে কাগজের টুকরো দিয়ে বাতাস করে সন্তানকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করছেন। প্রচণ্ড গরমে শিশুদের শরীরে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা।
তাদের দাবি, গাজায় সাধারণ বৈদ্যুতিক ফ্যান প্রবেশের অনুমতি দিলে ক্ষতির কী আছে? এসব ফ্যান দিয়ে কেউ অস্ত্র তৈরি করবে না এমন প্রশ্নও তুলছেন তারা।
স্থানীয় কারিগরদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ফ্যানের নতুন মোটর ও যন্ত্রাংশ গাজায় প্রবেশ না করায় পুরোনো ফ্যানই এখন ভরসা। ধ্বংসস্তূপ ও ভেঙে পড়া বাড়ির নিচ থেকে পুরোনো ফ্যান খুঁজে বের করে সেগুলো মেরামত করছেন অনেকে।
একজন ফ্যান মেরামতকারী জানান, নতুন যন্ত্রাংশ না থাকায় পুরোনো ও নষ্ট ফ্যানের বিভিন্ন অংশ জোড়াতালি দিয়ে কোনোভাবে সচল করা হচ্ছে। একটি ফ্যানকে সচল রাখতে একাধিক নষ্ট ফ্যানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা যুদ্ধের মধ্যে গাজায় খাদ্য, ত্রাণ ও বাণিজ্যিক পণ্যের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি আরও তীব্র হয়েছে। ২০২৫ সালেও কয়েক মাস ধরে পণ্য প্রবেশে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
পরবর্তীতে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও অনেক পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ অব্যাহত রয়েছে। ফলে গাজার মানুষের কাছে লাইটার কিংবা ফ্যানের মতো সাধারণ জিনিসও এখন হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক।
যে লাইটার ও ফ্যান একসময় ছিল দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ সামগ্রী, গাজায় এখন সেগুলোই মানুষের টিকে থাকার জন্য হয়ে উঠেছে অমূল্য সম্পদ।
সদ্য সংবাদ/এসএস