ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান স্নায়ুযুদ্ধ ক্রমেই সরাসরি সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রচ্ছন্ন হুমকি দেওয়ার পর তেহরান কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, কোনো হামলা হলে তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং যেসব প্রতিবেশী দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেসব দেশকেও লক্ষ্যবস্তু করবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, তেহরান ইতোমধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কসহ কয়েকটি দেশকে সতর্ক করেছে। তাদের ভূমি ব্যবহার করে বা তাদের দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি থেকে যদি কোনো সামরিক অভিযান চালানো হয়, তাহলে ইরান পাল্টা মিসাইল হামলা চালাবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। কাতারের আল-উদাইদ বিমানঘাঁটি থেকে কিছু মার্কিন কর্মীকে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যদিও কূটনীতিকেরা একে ‘বৃহৎ আকারের সরিয়ে নেওয়া’ বা পূর্ণাঙ্গ ইভাকুয়েশন বলতে নারাজ, তবে এটিকে ‘পোশ্চার চেঞ্জ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর তেহরান এই আল-উদাইদ ঘাঁটিতে পাল্টা মিসাইল হামলা চালিয়েছিল।
এর আগে মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছাড়াই বলেন, ‘সাহায্য আসছে।’ একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি কার্যকর করা শুরু করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব শক্ত ব্যবস্থা’ নেবে।
সামরিক চাপের পাশাপাশি ট্রাম্প ইরানের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপও আরোপ করেছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এতে চীন, ভারত ও তুরস্কের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলো সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আব্দুল্লাহিয়ান ও তার উপদেষ্টা আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তা ‘যাচাই করে দেখতে পারে’। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৬০০ ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে রাজধানী তেহরান ও আশপাশের এলাকায়।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল ব্যারো ইরানে চলমান দমন-পীড়নকে দেশটির সমসাময়িক ইতিহাসের ‘সবচেয়ে সহিংস’ অধ্যায় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইরানে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন—এখন কেবল সময় ও কৌশল নির্ধারণ বাকি। এর বিপরীতে, ইরান তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অনড় অবস্থান নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে হামলা থেকে বিরত রাখতে তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করেছে।